বোবায় ধরা বা ঘুমের মধ্যে হঠাৎ আটকে যাওয়ার অনুভূতি অনেকের জন্যই একটি প্রচণ্ড ভয় আর আতঙ্কের নাম। তবে সত্যিকার অর্থে বোবায় ধরা বা কোনো অশুভ শক্তির আক্রমণ বলতে কিছুই নেই। আমাদের সমাজে যে সমস্যাটি বোবায় ধরা নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত, চিকিৎসাশাস্ত্রের ভাষায় সেটি আসলে 'স্লিপ প্যারালাইসিস' বা ঘুমের মধ্যে পক্ষাঘাত।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেড-নেক সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. হাসানুল হক নিপুন এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বোবায় ধরার সঙ্গে ভূতে ধরা বা জ্বিনে ধরাসহ বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কারে অনেক মানুষই বিশ্বাস করেন। কিন্তু বিষয়টি মোটেও তা নয়।

স্লিপ প্যারালাইসিস মূলত ঘুমন্ত অবস্থা ও পুরোপুরি জাগরণের মধ্যবর্তী একটি জটিল অবস্থা। এটি সাধারণত ঘুমানোর মুহূর্তে অথবা ঘুম থেকে জেগে উঠার ঠিক আগ মুহূর্তে হতে পারে। বোবায় ধরা ব্যক্তি প্রায়ই একটি ভয়ংকর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যান। অনেক সময় তিনি ভয়ের কোনো দৃশ্য দেখতে পান, যেমন-ঘরের ভেতর অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো বস্তু বা প্রাণীর উপস্থিতি টের পান। কিন্তু সেই ভয়াবহ মুহূর্তে ওই ব্যক্তি কোনোভাবেই নিজের শরীর নাড়াতে বা কথা বলতে পারেন না।

কেন হয় এই স্লিপ প্যারালাইসিস?

ডা. হাসানুল হক নিপুনের মতে, মস্তিষ্কে গ্লাইসিন ও গামা অ্যামাইনোবিউটিরিক অ্যাসিড নামক দুই ধরনের রাসায়নিক পদার্থ আছে। এই দুই ধরনের রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণের ফলে মানুষের মাংসপেশী সাময়িকভাবে অসাড় হয়ে পড়ে। মস্তিষ্কের এই রাসায়নিক পদার্থ দুটি মূলত মস্তিষ্কে পেশী সক্রিয় রাখার কোষগুলোকে সুইচ অফ বা নিষ্ক্রিয় করে দেয়। যখন এই সুইচ অফ হয়ে যায়, ঠিক তখনই স্লিপ প্যারালাইসিস শুরু হয়।

ঘুমের চূড়ান্ত পর্যায় বা রেম (REM - Rapid Eye Movement) স্লিপের সময় একজন মানুষের চোখ খুব দ্রুত নড়াচড়া করে। মস্তিষ্কের সংবেদনশীল অংশ যদি রেপিড আই মুভমেন্ট স্লিপ থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসে, তখন ব্যক্তি জেগে ওঠেন। কিন্তু মস্তিষ্কের নিচের অংশটি যদি তখনও রেপিড স্লিপ মুভমেন্টে থাকে, তখন সেটি পেশীগুলোকে অবশ করার জন্য নিউরোট্রান্সমিটার পাঠাতে থাকে।

এই সময় মস্তিষ্কের মোটর কর্টেক্স শরীরকে নড়াচড়া করার সংকেত পাঠালেও পেশীগুলো অবশ হয়ে থাকায় মস্তিষ্ক কোনো প্রতিক্রিয়া সংকেত পায় না। তখন মস্তিষ্ক নিজে নিজেই একটা কাল্পনিক ব্যাখ্যা তৈরি করে। স্বাভাবিক জাগ্রত ও স্বপ্ন চেতনা মিশে গিয়ে তৈরি হয় ভয়ংকর হ্যালুসিনেশন। তখন মনে হতে পারে বুকের ওপর কেউ চেপে ধরেছে বা শরীরে কোনো প্রাণী ভর করেছে।

স্লিপ প্যারালাইসিসের প্রধান লক্ষণসমূহ

স্লিপ প্যারালাইসিসের বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষণ রয়েছে:

  • জাগরণের সময় শরীর নড়াচড়া করতে বা কথা বলতে না পারা।

  • ফিসফিস, গর্জন, ভয়েস বা গুঞ্জনের মতো অদ্ভুত শব্দ শোনা বা কল্পনা করা।

  • বুকের ওপর প্রচণ্ড ভারী চাপ অনুভব করা এবং শ্বাস নিতে ভীষণ অসুবিধা হওয়া।

  • তীব্র আতঙ্ক, অত্যাধিক ভয়ের অনুভূতি ও শরীর ঘেমে যাওয়া।

  • কোনো অতিপ্রাকৃত প্রাণী বা ব্যক্তি শ্বাসরোধ করছে এমন ভয়াবহ অনুভূতি হওয়া।

কাদের বোবায় বেশি ধরে?

সাধারণত ১৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে স্লিপ প্যারালাইসিস বেশি দেখা যায়। এছাড়া যারা অতিরিক্ত ধূমপান, মদপান বা ইয়াবাসহ বিভিন্ন নেশায় আসক্ত, তাদের এই সমস্যা বেশি হয়। যারা অবসাদগ্রস্ত থাকেন, যাদের ঘুম কম হয় (ইনসমনিয়া), অত্যন্ত ক্লান্ত থাকেন কিংবা যাদের ঘুমের নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি নেই, তারাও এই সমস্যায় বেশি ভোগেন। পরিবারে কারও স্লিপ প্যারালাইসিসের ইতিহাস থাকলে বা প্যানিক ডিসঅর্ডার থাকলেও এই সমস্যা হতে পারে।

চিকিৎসা ও মুক্তি পাওয়ার উপায়

ডা. হাসানুল হক বলেন, স্লিপ প্যারালাইসিস কদাচিৎ বা খুব কম হয়। কারও হয়তো ছয় মাসে বা বছরে একবার হয়। তবে যদি কারও এই সমস্যা ঘনঘন হয়, যেমন-সপ্তাহে দুই-তিন বার বা প্রতিদিন ঘুমের সময়, তাহলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

চিকিৎসা হিসেবে রোগীকে প্রাথমিকভাবে কাউন্সিলিং করতে হবে এবং বোঝাতে হবে যে এটি কোনো ভৌতিক সমস্যা নয়। অ্যালকোহল ও ধূমপান সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। মানসিক ক্লান্তি, অবসাদগ্রস্ততা, উদ্বেগ ও অশান্তি দূর করে সুস্থ ঘুমের রুটিন তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে রোগীর সমস্যা সঠিকভাবে শনাক্ত করে ওষুধ দেওয়ার কথাও বলেন ডা. হাসানুল হক। সচেতনতা বৃদ্ধি ও একটি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমেই স্লিপ প্যারালাইসিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।