সন্তান জন্মের পর শুধু মায়ের জীবনেই পরিবর্তন আসে না, বদলে যেতে পারে বাবার মস্তিষ্কও। নতুন বাবা হওয়ার অভিজ্ঞতা একজন পুরুষের চিন্তাভাবনা, আবেগ এবং সন্তানের প্রতি যত্ন নেওয়ার প্রবণতায় প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, পিতৃত্বের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু অংশের গঠন ও কার্যক্রমের পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। এ বিষয়টিকেই অনেক সময় বলা হয় ‘ড্যাড ব্রেইন’।
মাতৃত্বের পর নারীর শরীর ও মস্তিষ্কে পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হলেও পিতৃত্বের ক্ষেত্রে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। তবে নতুন গবেষণাগুলো বলছে, সন্তানের যত্ন নেওয়ার অভিজ্ঞতা বাবার মস্তিষ্ককেও নতুনভাবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে।
‘ড্যাড ব্রেইন’ বলতে কী বোঝায়?
‘ড্যাড ব্রেইন’ বলতে বাবা হওয়ার পর একজন পুরুষের মস্তিষ্কে দেখা দেওয়া সম্ভাব্য গঠনগত ও কার্যগত পরিবর্তনকে বোঝানো হয়। সন্তানের কান্না বোঝা, তার প্রয়োজনের প্রতি মনোযোগ দেওয়া, আবেগ বুঝতে শেখা এবং শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কাজে বাবার মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
২০১৪ সালের একটি গবেষণায় প্রধান পরিচর্যাকারী মা এবং সহায়ক পরিচর্যাকারী বাবাদের মস্তিষ্কের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষকেরা দেখতে পান, মা-বাবা উভয়ের ক্ষেত্রেই শিশুর যত্ন নেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের নেটওয়ার্কে পরিবর্তন দেখা যায়।
এই নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘মেন্টালাইজিং নেটওয়ার্ক’। এটি অন্যের অনুভূতি ও মানসিক অবস্থা বুঝতে, সহানুভূতি প্রকাশ করতে এবং সামাজিক আচরণে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে আবেগ প্রক্রিয়াকরণ নেটওয়ার্ক সতর্কতা, আবেগ এবং পুরস্কার-সংক্রান্ত অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত।
গবেষণায় প্রধান পরিচর্যাকারী মায়েদের ক্ষেত্রে আবেগ প্রক্রিয়াকরণ নেটওয়ার্কের সক্রিয়তা বেশি দেখা যায়। আর শিশুর সহায়ক পরিচর্যাকারী বাবাদের ক্ষেত্রে মেন্টালাইজিং নেটওয়ার্কের সক্রিয়তা তুলনামূলক বেশি ছিল। গবেষকদের ধারণা, শিশুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সময় কাটানো ও যত্ন নেওয়ার অভিজ্ঞতা এ ধরনের পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সন্তান জন্মের পর মস্তিষ্কের কিছু অংশ ছোট হতে পারে
২০২৩ সালে নতুন বাবাদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, সন্তান জন্মের পর তাঁদের মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থ বা গ্রে ম্যাটারের পরিমাণে কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। মস্তিষ্কের এই অংশ চিন্তা, স্মৃতি, আবেগ এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে।
তবে গ্রে ম্যাটারের পরিমাণ কমে যাওয়াকে সরাসরি মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া হিসেবে দেখার কারণ নেই। গবেষকেরা একে মস্তিষ্কের অভিযোজন বা পুনর্গঠনের একটি সম্ভাব্য অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এ ধরনের পরিবর্তনকে অনেক সময় ‘প্রুনিং’ বা অপ্রয়োজনীয় স্নায়বিক সংযোগ ছাঁটাইয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
প্রথমবার মা হওয়া নারীদের মস্তিষ্কেও একই ধরনের কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে। এতে ধারণা পাওয়া যায়, শুধু গর্ভধারণ বা সন্তান জন্মদান নয়, শিশুর পরিচর্যার অভিজ্ঞতাও মা-বাবার মস্তিষ্কে পরিবর্তন আনতে পারে।
বাবারাও প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন
সন্তান জন্মের পর মানসিক স্বাস্থ্যের আলোচনা সাধারণত মাকে কেন্দ্র করে হয়। কিন্তু নতুন বাবারাও বিষণ্নতা ও উদ্বেগের মতো সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। বিভিন্ন গবেষণায় প্রতি ১০ জন নতুন বাবার মধ্যে প্রায় একজনের পিতৃত্ব-পরবর্তী বিষণ্নতা বা উদ্বেগের অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে।
পুরুষদের ক্ষেত্রে এসব সমস্যার লক্ষণ সব সময় প্রচলিত বিষণ্নতার মতো নাও হতে পারে। কারও মধ্যে অতিরিক্ত বিরক্তি, হঠাৎ রেগে যাওয়া, অস্থিরতা, আক্রমণাত্মক আচরণ কিংবা মাদক ব্যবহারের প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
এ ধরনের মানসিক সমস্যা শুধু বাবার ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলে না। এর প্রভাব মায়ের মানসিক সুস্থতা এবং শিশুর যত্ন ও বিকাশের ওপরও পড়তে পারে। তাই নতুন বাবার মানসিক অবস্থার দিকেও পরিবারের সদস্যদের নজর দেওয়া জরুরি।
সন্তান জন্মের কয়েক মাস পর কেন বাড়তে পারে বাবার মানসিক চাপ?
মায়েদের ক্ষেত্রে প্রসব-পরবর্তী মানসিক সমস্যার লক্ষণ অনেক সময় সন্তান জন্মের পরপরই দেখা দিতে পারে। তবে বাবাদের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা সন্তানের জন্মের তিন থেকে ছয় মাস পর বেশি স্পষ্ট হতে পারে।
এর পেছনে কর্মজীবন, পারিবারিক দায়িত্ব এবং শিশুর যত্নের চাপ ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক বাবা সন্তানের জন্মের অল্প সময়ের মধ্যেই কাজে ফিরে যান। ফলে প্রথম দিকে শিশুর পরিচর্যার বড় অংশ মাকে সামলাতে হলেও পরবর্তী সময়ে বাবার দায়িত্ব বাড়তে পারে।
বিশেষ করে মা কর্মস্থলে ফিরে গেলে এবং আত্মীয়স্বজনের সহায়তা কমে গেলে শিশুর যত্ন, চাকরি ও পারিবারিক দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে বাবার ওপর মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে।
নতুন বাবাদেরও প্রয়োজন মানসিক ও পারিবারিক সহায়তা
সন্তান জন্মের পর মা ও বাবা উভয়েই নতুন দায়িত্বের মুখোমুখি হন। তাই শিশুর যত্নের পাশাপাশি দুজনের মানসিক স্বাস্থ্য, বিশ্রাম এবং আবেগগত চাহিদার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
নতুন বাবাকে শিশুর পরিচর্যায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা, পরিবারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং তাঁর অনুভূতি মনোযোগ দিয়ে শোনা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, অতিরিক্ত রাগ, ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ বা স্বাভাবিক কাজকর্মে আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে, বাবা হওয়া কেবল সামাজিক পরিচয়ের পরিবর্তন নয়। শিশুর সঙ্গে সম্পর্ক, পরিচর্যা ও দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা একজন পুরুষের মস্তিষ্ক এবং মানসিক অবস্থায়ও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সন্তান জন্মের পর শুধু মায়ের নয়, বাবার যত্ন ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন