বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়ে ওঠে আপনজনের সঙ্গ, কথা বলার মানুষ এবং মানসিক সমর্থন। কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, কর্মসংস্থানের জন্য স্থানান্তর এবং পারিবারিক দূরত্বের কারণে অনেক প্রবীণ মানুষকে কাটাতে হচ্ছে নিঃসঙ্গতায়। এই একাকীত্বকে কেন্দ্র করেই চীনে গড়ে উঠছে এক ধরনের নতুন সেবাভিত্তিক বাজার, যাকে বলা হচ্ছে ‘একাকীত্ব শিল্প’।
এই ব্যবস্থায় অর্থের বিনিময়ে প্রবীণদের সঙ্গে সময় কাটানো, গল্প করা, বাইরে ঘুরতে যাওয়া কিংবা দৈনন্দিন কাজে সঙ্গ দেওয়ার মতো সেবা পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ভাড়ায় বন্ধু বা সন্তানের মতো সঙ্গ দেওয়ার ধারণাও সামনে আসছে। মূলত যাঁদের পরিবারের সদস্যরা দূরে থাকেন কিংবা নিয়মিত সময় দিতে পারেন না, তাঁদের একাকীত্ব কিছুটা কমানোই এসব সেবার উদ্দেশ্য।
কেন বাড়ছে প্রবীণদের একাকীত্ব?
চীনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে প্রবীণদের জীবনযাত্রাতেও পরিবর্তন এসেছে। কলেজের গণ্ডি পেরোনোর পর অনেক তরুণ-তরুণী চাকরি ও উন্নত জীবিকার সন্ধানে নিজ শহর বা গ্রাম ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছেন। কর্মস্থলের কাছাকাছি থাকতে গিয়ে অনেকেই পরিবার থেকে দূরে বসবাস করছেন।
অন্যদিকে, পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা অনেক সময় নিজ বাড়িতে একা থেকে যান। সন্তানদের ব্যস্ত কর্মজীবন, দূরত্ব এবং সময়ের অভাবে নিয়মিত দেখা করা বা দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাটানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তাঁদের মধ্যে নিঃসঙ্গতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
সঙ্গ দেওয়াও যখন অর্থের বিনিময়ে সেবা
একাকীত্ব কমানোর এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের সেবার সুযোগ। অর্থের বিনিময়ে কেউ প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে গল্প করছেন, কেউ তাঁদের বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন, আবার কেউ দৈনন্দিন কাজে সহযোগিতা করছেন। এসব সেবায় মূল বিষয় শুধু কাজ করে দেওয়া নয়, বরং একজন মানুষের পাশে থেকে তাঁকে সময় দেওয়া।
এ ধরনের উদ্যোগ কিছু মানুষের জন্য সাময়িক সঙ্গ ও মানসিক স্বস্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে অর্থের বিনিময়ে পাওয়া সঙ্গ কখনোই পরিবারের সদস্য বা দীর্ঘদিনের সম্পর্কের জায়গা পুরোপুরি নিতে পারে না।
‘একাকীত্ব শিল্প’ ঘিরে প্রশ্ন
প্রবীণদের একাকীত্ব কমাতে এ ধরনের সেবা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। একদিকে এটি নতুন কর্মসংস্থান ও সেবার বাজার তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, মানুষের মৌলিক সামাজিক ও পারিবারিক চাহিদা যদি পুরোপুরি বাণিজ্যিক সেবার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তা সমাজের জন্য নতুন প্রশ্নও তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবীণদের সুস্থ ও সক্রিয় জীবন নিশ্চিত করতে পরিবার, স্থানীয় সমাজ এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া, সময় দেওয়া এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁদের যুক্ত রাখার উদ্যোগ একাকীত্ব কমাতে সহায়ক হতে পারে।
আধুনিক জীবনে অর্থনৈতিক উন্নতি ও কর্মব্যস্ততা বাড়লেও মানুষের মানসিক চাহিদা একই রয়ে গেছে। তাই ভাড়ায় বন্ধু বা সন্তানের মতো সঙ্গ দেওয়ার এই প্রবণতা শুধু নতুন ব্যবসার ধারণা নয়, বরং বদলে যাওয়া পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক বাস্তবতারও একটি প্রতিফলন।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন