বাংলাদেশের চিকিৎসক ডা. জারিন তাসনিম এবার উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমিয়েছেন ইউরোপে। মর্যাদাপূর্ণ ইরাসমাস মুন্ডুস বৃত্তি নিয়ে তিনি স্পেনের ওভিয়েদো শহরে দুর্যোগকালীন জনস্বাস্থ্য বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেছেন। চিকিৎসক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করলেও মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে ধীরে ধীরে জনস্বাস্থ্য ও মানবিক সংকট মোকাবিলার বিষয়ে আগ্রহী করে তোলে। দিনাজপুর, রংপুর ও কক্সবাজারে কাজের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে তাঁর এই ইউরোপযাত্রা যেন নতুন এক স্বপ্নের সূচনা।

ইরাসমাস মুন্ডুস বৃত্তি নিয়ে স্পেনে উচ্চশিক্ষা

সেপ্টেম্বরের এক সকালে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং কয়েক বছরের পেশাজীবনের স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন ডা. জারিন তাসনিম। নতুন শহর, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আবারও শিক্ষার্থীজীবনে ফিরে যাওয়ার ভাবনা তাঁর মনে তৈরি করেছিল এক ধরনের রোমাঞ্চ। একই সঙ্গে ছিল নতুন চ্যালেঞ্জের প্রত্যাশা।

তাঁর গন্তব্য স্পেনের ছোট্ট শহর ওভিয়েদো। সেখানে ইরাসমাস মুন্ডুস জয়েন্ট মাস্টার্স প্রোগ্রামের আওতায় দুর্যোগকালীন জনস্বাস্থ্য বিষয়ে পড়াশোনা করছেন তিনি।

ইরাসমাস মুন্ডুস বৃত্তি কী?

ইরাসমাস মুন্ডুস ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা কর্মসূচি। এর আওতায় বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে মাস্টার্স প্রোগ্রাম পরিচালনা করে। শিক্ষার্থীরা একই শিক্ষাক্রমের অংশ হিসেবে একাধিক দেশে পড়াশোনা ও ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান।

এই কর্মসূচির নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা বৃত্তির শর্ত অনুযায়ী পড়াশোনা ও জীবনযাপনের জন্য আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য ইউরোপে উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়।

চিকিৎসাবিদ্যা থেকে জনস্বাস্থ্যে আগ্রহের শুরু

মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় একজন চিকিৎসকের কাজ সম্পর্কে ধারণা অনেকটাই রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাকে ঘিরে থাকে। কিন্তু পেশাজীবনে প্রবেশের পর ডা. জারিন তাসনিম উপলব্ধি করেন, একজন মানুষ কেন অসুস্থ হন, তার উত্তর সব সময় শুধু শারীরিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

মানুষ কোথায় বসবাস করেন, তাঁর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন, নিরাপদ পানির সুযোগ রয়েছে কি না কিংবা তিনি কতটা মানসিক চাপে থাকেন, এসব বিষয়ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। এই উপলব্ধি তাঁকে চিকিৎসার প্রচলিত গণ্ডির বাইরে জনস্বাস্থ্য নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করে।

দিনাজপুরে গবেষণার মাধ্যমে পেশাজীবনের শুরু

ইন্টার্নশিপ শেষ করার পর ২০২০ সালে দিনাজপুরে আইসিডিডিআরবির একটি ক্লিনিক্যাল গবেষণায় যুক্ত হন ডা. জারিন। সেখানে কাজের মাধ্যমে চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।

গবেষণার এই অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝতে সাহায্য করে, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে শুধু চিকিৎসা প্রদান নয়, নির্ভরযোগ্য তথ্য ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রংপুরে স্বাস্থ্য কর্মসূচি নিয়ে কাজ

পরবর্তী সময়ে সেভ দ্য চিলড্রেনের সঙ্গে রংপুরে কাজ করার সুযোগ পান তিনি। সেখানে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য কর্মসূচি কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়, বাস্তবায়নের সময় কোথায় সমস্যা তৈরি হয় এবং সেবার ঘাটতি কীভাবে চিহ্নিত করা যায়, তা কাছ থেকে দেখেন।

এই অভিজ্ঞতা জনস্বাস্থ্য বিষয়ে তাঁর আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়।

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা

ডা. জারিন তাসনিমের পেশাজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল কক্সবাজারে কাজ করা। সেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন আনে।

বাস্তুচ্যুতি, অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংকট মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, তা তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর উপলব্ধি, সংকটের মধ্যে মানুষ শুধু চিকিৎসাসেবা চান না; তাঁরা নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং নিজের জীবনের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণও ফিরে পেতে চান।

এই অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝতে সাহায্য করে, দুর্যোগ ও মানবিক সংকটের সময় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকেই দুর্যোগকালীন জনস্বাস্থ্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষার আগ্রহ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ইরাসমাস মুন্ডুস বৃত্তি পাওয়ার পেছনের প্রস্তুতি

বৃত্তির আবেদন তৈরির ক্ষেত্রে ডা. জারিন তাসনিমের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করা। চিকিৎসাবিদ্যা থেকে জনস্বাস্থ্যে আসার কারণ, পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা এবং ভবিষ্যতে কোন ক্ষেত্রে অবদান রাখতে চান, এসব বিষয় তিনি গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছেন।

তাঁর মতে, একটি শক্তিশালী বৃত্তির আবেদন শুধু ভালো ফলাফল বা যোগ্যতার তালিকার ওপর নির্ভর করে না। আবেদনকারীর নিজের অভিজ্ঞতা, আগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে স্পষ্ট সংযোগ থাকা জরুরি।

অন্য কারও মতো নিখুঁত প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা না করে নিজের গল্প ও লক্ষ্য সৎভাবে তুলে ধরাই গুরুত্বপূর্ণ।

স্পেনের পর সুইডেনের কারোলিন্সকা ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা

ডা. জারিন তাসনিমের উচ্চশিক্ষার যাত্রা শুধু স্পেনেই সীমাবদ্ধ নয়। ওভিয়েদোর পর তাঁর পড়াশোনার পরবর্তী ধাপ সুইডেনের কারোলিন্সকা ইনস্টিটিউটে। এই যাত্রায় ভিন্ন দেশের শিক্ষক, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন তিনি।

একাধিক দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে আশা করা যায়।

চিকিৎসক পরিচয়ের নতুন অর্থ খুঁজছেন ডা. জারিন

ডা. জারিন তাসনিম এখনো নিজেকে প্রথমত একজন চিকিৎসক হিসেবেই দেখেন। তবে তাঁর কাছে চিকিৎসকের দায়িত্বের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। কখনো একজন রোগীর পাশে দাঁড়ানো, কখনো একটি জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা, কখনো গবেষণার মাধ্যমে কোনো সমস্যাকে সামনে আনা কিংবা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রমাণ পৌঁছে দেওয়া, সবই চিকিৎসকের ভূমিকার অংশ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

দিনাজপুর থেকে রংপুর, রংপুর থেকে কক্সবাজার এবং সেখান থেকে ইউরোপের পথে তাঁর এই যাত্রা তাঁকে একই প্রশ্নের কাছে ফিরিয়ে এনেছে—সংকটের মধ্যেও কীভাবে আরও বেশি মানুষের কাছে ন্যায়সংগতভাবে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া যায়?

দুর্যোগকালীন জনস্বাস্থ্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন ডা. জারিন তাসনিম। তাঁর এই যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে আগ্রহী তরুণদের জন্যও হতে পারে অনুপ্রেরণার একটি গল্প।