নতুন কোনো বার্তা বা নোটিফিকেশন আসেনি, মোবাইল সাইলেন্ট হয়ে আছে, তবু কিছুক্ষণ পরপর মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিন চেক করা- বর্তমান ডিজিটাল যুগে অনেকের দৈনন্দিন জীবনের একটি অত্যন্ত পরিচিত অভ্যাস। কখনো হয়তো সম্পূর্ণ অকারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোরাঘুরি করা হচ্ছে, আবার কখনো একই অ্যাপ বারবার খুলে দেখা হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি খুব সাধারণ একটি বিষয় মনে হলেও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে মূলত রয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের পুরস্কার পাওয়ার এক অদ্ভুত প্রত্যাশা, একঘেয়েমি ও মানসিক উদ্দীপনার চাহিদা।
বারবার ফোন দেখার কারণ কী?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কোনো নোটিফিকেশন না থাকলেও বারবার ফোন দেখার এই প্রবণতা মূলত মস্তিষ্কের পুরস্কার পাওয়ার ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি শেখা আচরণ। মানুষ যখনই প্রতিবার ফোন আনলক করে, তখন নতুন কোনো বার্তা, আকর্ষণীয় খবর কিংবা আনন্দদায়ক কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই অনিশ্চয়তাই মূলত মানুষকে বারবার ফোন চেক করতে উৎসাহিত করে।
তারা জানান, মস্তিষ্কে নতুন কিছু পাওয়ার একটা প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে সব সময় কোনো নোটিফিকেশন বা বার্তা আসে না। তারপরও মানুষের মস্তিষ্ক সবসময় সম্ভাব্য পুরস্কারের অপেক্ষায় থাকে। ধীরে ধীরে ফোন পরীক্ষা করার এই বিষয়টি মানুষের সচেতন সিদ্ধান্তের পরিবর্তে এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় অভ্যাসে পরিণত হয়।
একঘেয়েমি ও উদ্বেগের প্রভাব
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি, মানসিক উদ্বেগ এবং অবসর সময় কাটাতে অস্বস্তিও ফোন দেখার এই বদভ্যাসের অন্যতম প্রধান কারণ। অনেকেই একাকিত্ব, অনিশ্চয়তা কিংবা মানসিক অস্বস্তির মুহূর্তে তাৎক্ষণিক আরাম পেতে ফোনের আশ্রয় নেন। বার্তা দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা কিংবা বিভিন্ন ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে তারা সাময়িক বিনোদন খোঁজেন।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোনো বার্তা, সামাজিক আপডেট কিংবা বড় কোনো সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার অমূলক আশঙ্কা থেকেও মানুষের মাঝে বারবার ফোন দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা সংক্ষেপে 'ফোমো' (FOMO) বলা হয়। আশপাশের মানুষকে সারাক্ষণ ফোন ব্যবহার করতে দেখা কিংবা হাতের কাছেই সবসময় ফোন রেখে দেওয়াও এই ক্ষতিকর অভ্যাসকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে পারে।
কখন বুঝবেন অভ্যাসটি সমস্যা হয়ে উঠছে?
মনোবিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে বলেন, মাঝেমধ্যে কাজের ফাঁকে ফোন দেখা এবং এমনভাবে ফোন ব্যবহার করা, যা আপনার দৈনন্দিন কাজে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়- এই দুটি বিষয় কখনোই এক নয়। ফোন থেকে কিছুক্ষণ দূরে থাকলে তীব্র অস্থিরতা অনুভব করা, কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা কিংবা বন্ধ করার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বারবার ফোন পরীক্ষা করা- এই অভ্যাসটি যে ধীরে ধীরে আসক্তির মতো গভীর হচ্ছে, তা বোঝার অন্যতম প্রধান লক্ষণ হতে পারে।
যেভাবে কমাবেন ফোন দেখার প্রবণতা
এই অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য হঠাৎ করে ফোন পুরোপুরি ব্যবহার বন্ধ করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং ঠিক কোন পরিস্থিতিতে ফোন দেখার তীব্র তাগিদ তৈরি হচ্ছে, তা আগে বোঝা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো- অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশনগুলো সবসময় বন্ধ রাখা, গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় ফোন হাতের নাগালের বাইরে রাখা এবং প্রতিদিন অন্তত কিছুক্ষণ কোনো ধরনের ডিজিটাল উদ্দীপনা ছাড়াই সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তোলা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের আচরণ ও অভ্যাস সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে পারলে অপ্রয়োজনীয় ফোন ব্যবহারের এই ক্ষতিকর প্রবণতা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব এবং এর ফলে দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ অনেকগুণ বাড়ানো সম্ভব।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন