অনেক সময়ই সকালে ঘুম থেকে উঠে কথা বলতে গিয়ে মনে হয় যেন গলার স্বর আর আগের মতো স্বাভাবিক নেই। আওয়াজ যেন একেবারে হারিয়ে গেছে। এটা শুধু আপনার বা আমার একার সমস্যা নয়, বরং সর্দি-কাশির সময় এমন কণ্ঠস্বরের সমস্যা অনেকেরই হয়ে থাকে। কারও কারও গলা হয়ে যায় কর্কশ, আবার কারও কথা বলতেই অনেক কষ্ট হয়। কিন্তু ঠান্ডা লাগলে হঠাৎ কেন এমন হয়?
এর পেছনে মূলত আমাদের শরীরের বেশ কয়েকটি কারণ লুকিয়ে রয়েছে। আমাদের স্বরযন্ত্রের একটি বিশেষ ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়া রয়েছে। ঠান্ডা লাগলে স্বরযন্ত্রে হঠাৎ গলা বসে যাওয়া এবং কণ্ঠস্বর পুরোপুরি বদলে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে-ল্যারিঞ্জাইটিস (Laryngitis) বা স্বরযন্ত্রের মারাত্মক প্রদাহ। আমাদের গলার ভেতরের অংশে থাকা ল্যারিন্স বা স্বরযন্ত্রের মধ্যে মূলত দুটি পেশিবহুল পর্দা থাকে, যাদের বিজ্ঞানের ভাষায় ভোকাল কর্ড বা স্বরতন্ত্রী বলা হয়।
স্বাভাবিক ও সুস্থ অবস্থায় আমরা যখন কথা বলি, তখন ফুসফুস থেকে বাতাস বের হওয়ার সময় এই ভোকাল কর্ডগুলো কাঁপে বা প্রাকৃতিকভাবে কম্পিত হয়, আর ঠিক এর ফলেই আমাদের কণ্ঠস্বর বা আওয়াজ তৈরি হয়। ঠান্ডা লাগলে সেই চিরচেনা কণ্ঠস্বর বদলে যাওয়ার পেছনের মূল শারীরিক প্রক্রিয়াগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
স্বরাঙ্গ বা ভোকাল কর্ডের ফোলাভাব: মূলত সর্দি-কাশি বা যেকোনো ভাইরাল সংক্রমণের কারণে স্বরযন্ত্রে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন তৈরি হয়। এতে ভোকাল কর্ড বা স্বরতন্ত্রীগুলো ফুলে গিয়ে বেশ ভারি হয়ে যায়।
১. স্বাভাবিক কম্পনে বাধা: কর্ডগুলো ফুলে যাওয়ার ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাস চলাচলের সময় সেগুলো আর স্বাভাবিকভাবে কাঁপতে বা ভাইব্রেট করতে পারে না। এর ফলে গলার আওয়াজ কর্কশ, ফিসফিসে বা ফ্যাসফ্যাসে হয়ে যায়, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় 'হোর্সনেস' (Hoarseness) নামে বহুল পরিচিত।
২. শ্লেষ্মা বা মিউকাসের প্রভাব: অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগলে গলার পেছনের দিকে অতিরিক্ত শ্লেষ্মা বা কফ জমা হয়। এর ফলে স্বরযন্ত্রের স্বাভাবিক পিচ্ছিলভাব বা লুব্রিকেশন কমে যায় এবং কথা বলার সময় সেখানে ঘষা লেগে স্বর আরও বেশি খসখসে হয়ে ওঠে।
৩. অতিরিক্ত চাপ: নাক বন্ধ থাকার কারণে বাধ্য হয়ে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া এবং অনবরত কাশির ফলে ভোকাল কর্ডের ওপর ভীষণ মাত্রায় বাড়তি চাপ পড়ে, যা গলার স্বাভাবিক স্বরকে সাময়িকভাবে পুরোপুরি থামিয়ে দিতে পারে।
গলা বসে গেলে দ্রুত সুস্থ হওয়ার ঘরোয়া উপায়
সাধারণত ঠান্ডা জনিত কারণে হঠাৎ গলা বসলে তা ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে ভয়েস রেস্ট ও সাধারণ যত্নেই ঠিক হয়ে যায়।
১. কণ্ঠস্বরের সম্পূর্ণ বিশ্রাম: জোরে কথা বলা, চিৎকার করা—এমনকি ফিসফিস করে কথা বলা থেকেও সম্পূর্ণ বিরত থাকুন। কারণ ফিসফিস করে কথা বললে ভোকাল কর্ডে আরও বেশি মাত্রায় চাপ পড়ে।
২. লবণপানির গড়গড়া: হালকা গরম পানিতে সামান্য লবণ মিশিয়ে দিনে অন্তত ৪ বার কুলকুচি বা গড়গড়া (গার্গল) করুন। এটি আপনার গলার ফোলাভাব ও অস্বস্তি দ্রুত কমায়।
৩. গরম পানির ভাপ (স্টিম ইনহেলেশন): ফুটন্ত গরম পানির বাষ্প মুখ ও গলা দিয়ে দিনে অন্তত ১০ মিনিট ধীরে ধীরে টেনে নিন। এতে স্বরতন্ত্রীর শুষ্কতা দূর হয় এবং আরাম মেলে।
৪. পর্যাপ্ত তরল ও আদা-লেবু চা: সারাদিন ধরে কুসুম গরম পানি পান করুন। এছাড়া লেবু ও আদা চা গলার ইনফেকশন দ্রুত কমাতে দারুণ সাহায্য করে।
কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন?
গলার স্বর পরিবর্তন হওয়াটা খুব সাধারণ একটি বিষয় মনে হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটিকে মোটেও অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ গলার স্বর যদি টানা তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বসে থাকে, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। আর কথা বলার সময় বা খাবার গিলতে গিয়ে তীব্র ব্যথা হলে কিংবা কোনোভাবে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার কাশির সঙ্গে রক্ত এলে কিংবা ঘাড় বা গলার অংশে কোনো অস্বাভাবিক চাকা বা পিণ্ড দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন