জের প্রচণ্ড চাপ, রাস্তার দীর্ঘ যানজট কিংবা পথেঘাটে থাকা অপরিচ্ছন্ন শৌচাগারের কারণে অনেকেই তীব্র প্রস্রাবের বেগ অনুভব করেও বাধ্য হয়ে তা দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখেন। তবে প্রশ্ন হলো, একবার টানা এক ঘণ্টা প্রস্রাব আটকে রাখলেই কি শরীরের সত্যিই বড় কোনো ক্ষতি হয়? চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বলছে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে এমনটা সাময়িকভাবে ঘটলে তা সাধারণত গুরুতর কোনো ক্ষতির কারণ হয় না। তবে নিয়মিত দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব চেপে রাখার এই অভ্যাসটি এড়িয়ে চলা সবার জন্যই উচিত।
মূত্রথলিতে আসলে কী ঘটে?
মানুষের কিডনি প্রতিনিয়ত রক্ত পরিশোধন করে প্রস্রাব তৈরি করে, যা মূত্রনালির মাধ্যমে ধীরে ধীরে মূত্রথলিতে গিয়ে জমা হতে থাকে। মূত্রথলি প্রসারিত হতে থাকলে সেখানকার সূক্ষ্ম স্নায়ুগুলো মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। এর ফলেই মূলত আমরা প্রস্রাবের বেগ অনুভব করি।
একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মূত্রথলিতে সাধারণত ৩৫০ থেকে ৫০০ মিলিলিটার প্রস্রাব ধারণ হতে পারে। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিভেদে মূত্রথলির এই ধারণক্ষমতা এবং প্রস্রাবের বেগ অনুভবের সময়কাল ভিন্ন হতে পারে। প্রস্রাবের বেগ অনুভব করার পরও যদি বাধ্য হয়ে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, তবে তলপেটে প্রচণ্ড চাপ, অস্বস্তি ও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এতে কাজেও মনোযোগ অনেকাংশে কমে যেতে পারে। তবে মূত্রথলি স্বাভাবিকভাবে কাজ করলে এবং অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা না থাকলে, মাত্র একবার এক ঘণ্টা প্রস্রাব আটকে রাখায় সাধারণত স্থায়ী কোনো ক্ষতি হয় না।
নিয়মিত প্রস্রাব চেপে রাখলে কী সমস্যা হতে পারে?
মাঝেমধ্যে অনিচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে প্রস্রাব আটকে রাখা এবং নিয়মিত অভ্যাস হিসেবে দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাবের বেগ উপেক্ষা করা মোটেও এক বিষয় নয়। দীর্ঘদিন এমন ক্ষতিকর অভ্যাস চলতে থাকলে কিছু মানুষের মূত্রথলির স্বাভাবিক কার্যক্রমে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে আগে থেকেই প্রস্রাবের প্রবাহে কোনো বাধা, মূত্রথলির কার্যকারিতায় সমস্যা কিংবা প্রস্রাব পুরোপুরি বের না হওয়ার প্রবণতা থাকলে এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেশি হতে পারে।
তবে প্রস্রাব আটকে রাখলেই যে অনিবার্যভাবে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা ইউটিআই (UTI) হবে, তা নয়। কিন্তু মূত্রথলি যদি ঠিকমতো খালি না হয়, তবে এই সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়তে পারে। তাই প্রস্রাবের বেগ নিয়মিত উপেক্ষা না করে সুযোগ পেলেই দ্রুত শৌচাগারে যাওয়া ভালো।
কিডনির ক্ষতির আশঙ্কা কতটা?
সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে মাত্র এক ঘণ্টা প্রস্রাব আটকে রাখলেই কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়-এমন জনপ্রিয় ধারণার আসলে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে মূত্রথলিতে প্রস্রাব জমে থাকা, মূত্রথলি পুরোপুরি খালি করতে না পারা কিংবা প্রস্রাবের প্রবাহে বাধা তৈরি হলে মূত্রথলির ভেতরে অস্বাভাবিকভাবে চাপ বেড়ে যেতে পারে। গুরুতর বা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষেত্রে এই মাত্রাতিরিক্ত চাপ সরাসরি কিডনির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া প্রস্রাব পুরোপুরি বের না হওয়া এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণে মূত্রথলিতে পাথর তৈরির ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তবে শুধু প্রস্রাব চেপে রাখার অভ্যাস থেকেই যে পাথর হবেই, বিষয়টা এমন নয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
প্রস্রাবের বেগ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে, প্রস্রাবের সময় অতিরিক্ত ব্যথা বা জ্বালাপোড়া হলে কিংবা প্রস্রাব করার পরও মূত্রথলি ভরা মনে হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একেবারেই প্রস্রাব করতে না পারা, বিশেষ করে তলপেটে তীব্র ব্যথা বা ফুলে যাওয়ার অনুভূতি থাকলে, তা জরুরি চিকিৎসার লক্ষণ হিসেবে ধরতে হবে। এ ছাড়া জ্বর, কাঁপুনি, বমি কিংবা পিঠের এক পাশে তীব্র ব্যথার সঙ্গে প্রস্রাবের সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্রাবের বেগ শরীরের একটি খুবই স্বাভাবিক সংকেত। তাই অকারণে বারবার এই সংকেতকে উপেক্ষা না করে মূত্রথলির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখাই সুস্থ থাকার অন্যতম প্রধান উপায়। প্রস্রাবের বেগ অনুভব করলে সম্ভব হলে দ্রুত শৌচাগারে যান এবং শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করুন।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন