দৃষ্টিহীন মৌমির সাফল্য যেন হার না মানার এক অনন্য গল্প। জন্ম থেকেই চোখে দেখতে পান না তাহমিনা আক্তার মৌমি। তবে দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও স্বপ্ন দেখার সাহস হারাননি তিনি। সব বাধা পেরিয়ে এবারের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে সবাইকে চমকে দিয়েছেন এই শিক্ষার্থী। তাঁর এমন ফলাফল পরিবার, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি নতুন করে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

মৌমি সিলেট সরকারি মদন মোহন কলেজের শিক্ষার্থী। তাঁর বাড়ি মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর গ্রামে। বাবা আব্দুল আহাদ ও মা আমিনা আক্তার পুষ্পের মেয়ে তিনি। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। বর্তমানে সিলেটে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণে কাজ করা গ্রিন ডিসএবিল্ড ফাউন্ডেশনের (জিডিএফ) আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

মৌমির এই অর্জনে আনন্দিত জিডিএফ কর্তৃপক্ষও। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক বায়েজিদ আহমদ খান জানান, প্রথম শ্রেণি থেকেই মৌমি তাঁদের প্রতিষ্ঠানের আবাসিক শিক্ষার্থী। দীর্ঘদিনের পরিচিত এই শিক্ষার্থীর এমন ফলাফলে তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। তাঁর মতে, মৌমির সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদেরও এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগাবে।

নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে মৌমি বলেন, চোখে পৃথিবীর আলো দেখতে না পেলেও স্বপ্ন দেখার অধিকার সবার রয়েছে। এই অর্জন শুধু তাঁর একার নয়; এর পেছনে বাবা-মা, শিক্ষক এবং জিডিএফের অবদান রয়েছে। শারীরিক সীমাবদ্ধতা যেন শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে, সেই বার্তাই নিজের সাফল্যের মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশের সেবা করার স্বপ্ন দেখেন এই শিক্ষার্থী।

মেয়ের ফলাফলে আবেগাপ্লুত বাবা আব্দুল আহাদ। তিনি জানান, জন্ম থেকেই দৃষ্টিশক্তিহীন হলেও মেয়ের পড়াশোনার আগ্রহ কখনো কমতে দেননি তাঁরা। বরং সব সময় তাকে উৎসাহ দিয়েছেন। আজ মেয়ের এমন অর্জনে বাবা-মা হিসেবে তাঁরা ভীষণ গর্বিত। মৌমি যেন ভবিষ্যতে নিজের লক্ষ্য পূরণ করতে পারেন, সে জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।

দৃষ্টিশক্তি না থাকায় এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় মৌমিকে শ্রুতিলেখকের সহায়তা নিতে হয়েছে। তাঁর হয়ে পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখেছেন পল্লব রায়। তিনি হাজী আব্দুস সাত্তার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি উত্তীর্ণ একজন শিক্ষার্থী। মৌমির মুখে বলা উত্তরগুলো যথাযথভাবে খাতায় তুলে ধরতে সহযোগিতা করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে দৃষ্টিহীন মৌমির জিপিএ-৫ অর্জন শুধু একটি ভালো ফল নয়, বরং অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও সহযোগিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।