শীতের হিমেল হাওয়া বইতে শুরু করলেই কমবেশি সবারই ঠান্ডা লেগে যায়। আর ঠান্ডা লাগার প্রথম ও সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক লক্ষণগুলোর একটি হলো গলাব্যথা। এই সময়ে কথা বলতে, খাবার গিলতে এমনকি ঠিকমতো বিশ্রাম নিতেও অস্বস্তি বোধ হয়। সাধারণ ফ্লুর লক্ষণগুলো এক সপ্তাহের মধ্যে এমনিতেই সেরে যায়, তবে গলার এই অস্বস্তি কমাতে ইন্টারনেটে বিভ্রান্ত না হয়ে নির্ভরযোগ্য ঘরোয়া উপায়গুলো বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। ঘরে থাকা সাধারণ কিছু প্রাকৃতিক উপাদান দিয়েই আপনি পেতে পারেন দ্রুত আরাম।

চলুন জেনে নিই শীতকালে গলাব্যথা দূর করার কার্যকরী ৯টি সহজ ঘরোয়া উপায়:

১. হালকা গরম পানিতে লবণ গার্গল

গলাব্যথায় সবচেয়ে পুরোনো ও সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি এটি। লবণ-পানির গার্গল গলার ফোলাভাব ও প্রদাহ কমাতে এবং আঁঠালো শ্লেষ্মা আলগা করতে সাহায্য করে বলে চিকিৎসকেরা সাধারণত পরামর্শ দেন।

এক গ্লাস হালকা গরম পানিতে আধা চা-চামচ লবণ ভালোভাবে গুলে নিন। পানি খুব গরম হলে গলার ক্ষতি হতে পারে, তাই সহনীয় উষ্ণতা রাখুন। এবার মাথা পেছনে হেলিয়ে প্রায় ৩০ সেকেন্ড গার্গল করুন এবং পানি ফেলে দিন, গিলবেন না। দিনে দুই থেকে তিনবার করলে আরাম মেলে। তবে ছোট শিশুদের গার্গল করাবেন না, তারা পানি গিলে ফেলতে পারে।

২. মধু মেশানো গরম পানি বা হার্বাল চা

মধুর আস্তরণ-সদৃশ ঘন গঠন গলার ভেতরে একটা প্রলেপ তৈরি করে। এতে জ্বালাপোড়া ও খুসখুসে কাশি কিছুটা কমে। মধুর প্রশান্তিদায়ক গুণের কথা বহুদিন ধরেই বলা হয়, আর কাশি কমাতে এর ভূমিকা নিয়ে গবেষণাও আছে।

এক কাপ গরম পানি বা হার্বাল চায়ে এক থেকে দুই চা-চামচ মধু মেশান। চাইলে কয়েক ফোঁটা লেবুর রসও দিতে পারেন। তাড়াহুড়ো না করে ধীরে ধীরে চুমুক দিন, যাতে গলায় কিছুক্ষণ থাকে। সতর্কতা: এক বছরের কম বয়সী শিশুকে কখনো মধু দেওয়া যাবে না।

৩. আদা চা

আদা শীতের অতি পরিচিত উপাদান। এতে থাকা প্রদাহ-বিরোধী যৌগ গলার ফোলাভাব ও অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে। গরম চায়ের উষ্ণতাও আলাদা আরাম দেয়।

তাজা আদা ছোট টুকরো করে বা থেঁতো করে এক কাপ পানিতে ৫-১০ মিনিট ফুটিয়ে ছেঁকে নিন। গরম থাকতেই পান করুন। স্বাদ ও উপকার বাড়াতে মধু ও লেবুর রস মেশানো যায়। দিনে দুই-তিন কাপ পর্যন্ত খাওয়া যেতে পারে। আদা তাজা বা শুকনো, দুভাবেই কাজে লাগে। চা ছাড়াও গরম পানি বা স্যুপে আদা মিশিয়ে খেতে পারেন।

৪. আদার রস ও মধু

আদা আর মধু আলাদাভাবে যেমন উপকারী, একসঙ্গে মিললে আরও কার্যকর হতে পারে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মধুর সঙ্গে আদা মিললে অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল প্রভাব তৈরি হয়। অর্থাৎ জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই জুটি সহায়ক হতে পারে।

একটুকরো আদা কুঁচি করে চামচ দিয়ে চেপে রস বের করুন। এক চা-চামচ আদার রসে এক চা-চামচ মধু মিশিয়ে সরাসরি খেয়ে নিন। রস বেশ ঝাঁঝালো হয়, তাই সহ্য না হলে সামান্য কুসুম গরম পানি মিশিয়ে নিতে পারেন। পেটে অস্বস্তি থাকলে খালি পেটে না খাওয়াই ভালো।

৫. রাতে হলুদ দুধ

আমাদের দেশে ঠান্ডা-কাশির ঘরোয়া চিকিৎসার কথা উঠলেই হলুদ দুধের নাম আসে। একে অনেকে "সোনালি দুধ" বলেন। হলুদে থাকা কারকিউমিন একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা প্রদাহ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হয়। গরম দুধ গলাকে আরাম দেয়, আর রাতে ঘুমানোর আগে খেলে ঘুমও ভালো হয়। তবে মনে রাখা ভালো, হলুদ দুধের কার্যকারিতা মূলত ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল, বড় পরিসরের গবেষণা এখনো সীমিত।

এক কাপ গরম দুধে আধা চা-চামচ হলুদ গুঁড়া ভালো করে মিশিয়ে ঘুমানোর আগে পান করুন। গলা অনেক বেশি ব্যথা করলে বা স্বর বসে গেলে নিয়মিত কয়েক রাত খেয়ে দেখতে পারেন। স্বাদ ভালো করতে একটু মধু দিলে চলবে।

৬. গরম পানির ভাপ নেওয়া

নাক বন্ধ, গলা শুকনো, এমন অবস্থায় ভাপ নিলে অনেকেই স্বস্তি পান। ভাপের আর্দ্র বাতাস শুকিয়ে যাওয়া গলার টিস্যুকে ভিজিয়ে দেয় এবং নাক-গলায় জমে থাকা শ্লেষ্মা আলগা করতে সাহায্য করে।

একটি বড় বাটিতে গরম পানি নিন, মাথায় তোয়ালে ঢেকে বাটির ওপর মুখ ঝুঁকিয়ে ১০ মিনিট মতো ভাপ টানুন। দিনে দুবার করা যায়। সতর্কতা: পানি ফুটন্ত অবস্থায় বা মুখ খুব কাছে নিয়ে ভাপ নেবেন না, ঝলসে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। শিশুদের এভাবে ভাপ নেওয়ানো একেবারেই উচিত নয়।

৭. তুলসী পাতার পানীয়

ঠান্ডা, কাশি ও গলাব্যথায় তুলসী পাতা আমাদের উপমহাদেশে বহুকালের চেনা ঘরোয়া উপাদান। আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞরা বলেন, তুলসী গলার ব্যথা কমানোর পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও সহায়ক।

এক কাপ পানিতে ৫-৭টি তুলসী পাতা দিয়ে কয়েক মিনিট ফুটিয়ে নিন, তারপর ছেঁকে কুসুম গরম অবস্থায় পান করুন। স্বাদের জন্য আদা বা মধু মেশানো যায়। সকালে ও সন্ধ্যায় এক কাপ করে খেতে পারেন।

৮. মধু ও গোলমরিচ

গলা যখন কিছুতেই খুসখুস করা থামায় না, তখন অনেকে মধু আর গোলমরিচের মিশ্রণের ওপর ভরসা রাখেন। মধু গলাকে প্রলেপ দিয়ে আরাম দেয়, আর গোলমরিচের উষ্ণ ঝাঁঝ কফ পাতলা করতে সাহায্য করে বলে ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বাস করা হয়।

এক চা-চামচ মধুতে এক চিমটি গোলমরিচের গুঁড়া মিশিয়ে ধীরে ধীরে চেটে খান। গোলমরিচ খুব অল্প দিতে হবে, বেশি হলে উল্টো গলা জ্বলতে পারে। দিনে এক-দুবারের বেশি না খাওয়াই ভালো।

৯. বরফ চোষা ও পর্যাপ্ত তরল

এই উপায়টি অনেকের কাছে অবাক লাগতে পারে। গলাব্যথা মানেই গরম কিছু, এমন ধারণা প্রচলিত। কিন্তু যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) বলছে, গলাব্যথায় গলা যতটা সম্ভব আর্দ্র রাখা জরুরি। বরফের টুকরো বা আইস ললি চুষলে তাৎক্ষণিক আরাম মেলে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, ঠান্ডা গলার ভেতরের ফোলা টিস্যুতে শীতল প্রভাব ফেলে এবং স্নায়ুপ্রান্তের তাপমাত্রা কমিয়ে ব্যথার সংকেত কমিয়ে দেয়। টনসিল অপারেশনের পরও অনেক চিকিৎসক রোগীকে ঠান্ডা আইসক্রিম খেতে বলেন, এর পেছনেও একই কারণ।

বরফ চোষার পাশাপাশি সারা দিন নিয়মিত তরল খান। কুসুম গরম পানি, ঝোল বা স্যুপ, হার্বাল চা এবং পাতলা ফলের রস সবই ভালো। তরল গলা ভেজা রাখে, আর পর্যাপ্ত পানি শরীরকে সংক্রমণের সঙ্গে লড়তেও সাহায্য করে। গরম বা ঠান্ডা, যেটায় আপনার বেশি আরাম লাগে, সেটাই বেছে নিন।

আরাম বাড়াতে আরও কিছু অভ্যাস

ঘরোয়া উপায়গুলোর পাশাপাশি কিছু ছোট ছোট অভ্যাস সেরে ওঠার গতি বাড়াতে পারে।

  • কণ্ঠকে বিশ্রাম দিন। গলা ও স্বরযন্ত্র সেরে উঠতে সময় চায়। এ সময় বেশি কথা বলা বা চিৎকার করা এড়িয়ে চলুন।

  • ঘরের বাতাস আর্দ্র রাখুন। হিউমিডিফায়ার থাকলে ব্যবহার করুন। শুষ্ক বাতাসে গলা আরও শুকিয়ে যায়।

  • নরম খাবার বেছে নিন। সহজে গেলা যায় এমন খাবার খান। ঝাল, টক ও কড়কড়ে খাবার আপাতত বাদ দিন।

  • ধূমপান থেকে দূরে থাকুন। ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান দুটোই গলার জ্বালা বাড়ায় এবং সেরে উঠতে দেরি করায়।

  • শীত থেকে নিজেকে বাঁচান। সন্ধ্যার পর বা রাতে বাইরে গেলে মাথা ও কান ঢেকে রাখুন। গরম পানিতে গোসল করুন এবং ভেজা চুলে ঘুমাবেন না।

কখন ডাক্তার দেখাবেন

ঘরোয়া উপায় আরাম দিতে পারে, কিন্তু সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন:

  • গলাব্যথা এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে

  • জ্বর ১০১° ফারেনহাইট (৩৮.৩° সেলসিয়াস) ছাড়ালে

  • গলা বা টনসিলে সাদা দাগ দেখা গেলে

  • খাবার গিলতে বা শ্বাস নিতে কষ্ট হলে

ছয় মাসের কম বয়সী শিশু, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগা ব্যক্তিরা নিজে থেকে কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।