হাতে কলম ধরতে গিয়ে কাঁপুনি, চায়ের কাপ তুলতে সমস্যা কিংবা ছোটখাটো কাজ করতে গিয়ে হাত স্থির রাখতে না পারা এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হতে পারে। হাত কাঁপা সব সময় সাধারণ দুর্বলতার লক্ষণ নয়। কখনো মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব বা অতিরিক্ত চা-কফি পান করার কারণে সাময়িকভাবে এমন হতে পারে। আবার থাইরয়েডের সমস্যা কিংবা স্নায়ুতন্ত্রের রোগও এর পেছনে থাকতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে শরীরের কোনো অংশের অনিচ্ছাকৃত ছন্দময় কাঁপুনিকে বলা হয় ট্রেমর।
হাত কাঁপার একটি সাধারণ কারণ হলো অতিরিক্ত মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব। ভয়, উত্তেজনা বা দুশ্চিন্তার সময় শরীরে কিছু হরমোনের প্রভাব বেড়ে হাত কাঁপতে পারে। একইভাবে অতিরিক্ত চা, কফি বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় গ্রহণ করলেও কাঁপুনি দেখা দিতে পারে। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়ার কারণেও হাত কাঁপা, ঘাম হওয়া, দুর্বল লাগা বা বুক ধড়ফড় করার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
হাত কাঁপার আরেকটি কারণ হতে পারে থাইরয়েড গ্রন্থির অতিরিক্ত সক্রিয়তা বা হাইপারথাইরয়েডিজম। এ অবস্থায় হাত কাঁপার পাশাপাশি ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, গরম সহ্য করতে না পারা, বুক ধড়ফড় এবং অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও কাঁপুনি হতে পারে। তাই কোনো ওষুধ খাওয়ার পর নতুন করে সমস্যা শুরু হলে চিকিৎসককে বিষয়টি জানানো জরুরি। নিজের সিদ্ধান্তে কোনো ওষুধ বন্ধ করা ঠিক নয়।
স্নায়ুতন্ত্রের কিছু সমস্যার কারণেও দীর্ঘদিন হাত কাঁপতে পারে। যেমন, অ্যাসেনসিয়াল ট্রেমরে সাধারণত হাত ব্যবহার করার সময় কাঁপুনি বেশি বোঝা যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে মাথা বা শরীরের অন্য অংশেও কাঁপুনি হতে পারে এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও এ সমস্যার ইতিহাস থাকতে পারে। অন্যদিকে, পারকিনসন রোগে সাধারণত বিশ্রামের সময় কাঁপুনি দেখা দিতে পারে। এর সঙ্গে চলাফেরার গতি কমে যাওয়া, শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া এবং ভারসাম্য রাখতে অসুবিধা হতে পারে। তবে শুধু হাত কাঁপার লক্ষণ দেখে কোনো নির্দিষ্ট রোগ নিশ্চিত করা যায় না।
হাত কাঁপা বারবার হলে, ধীরে ধীরে বাড়লে কিংবা লেখা, খাওয়া বা দৈনন্দিন কাজে সমস্যা তৈরি করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসক জানতে চাইতে পারেন কখন কাঁপুনি শুরু হয়, বিশ্রামে নাকি কাজ করার সময় বেশি হয় এবং কী কী ওষুধ গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী থাইরয়েড হরমোন, রক্তে শর্করাসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করা হতে পারে। রোগীর অবস্থা বুঝে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন। হঠাৎ হাত কাঁপার সঙ্গে মুখ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া কিংবা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে স্ট্রোকের আশঙ্কা থাকতে পারে। এমন হলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
হাত কাঁপার চিকিৎসা নির্ভর করে এর প্রকৃত কারণের ওপর। থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে তার চিকিৎসা করতে হয়; আবার কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ পরিবর্তন করতে পারেন। অ্যাসেনসিয়াল ট্রেমরের ক্ষেত্রে উপসর্গ অনুযায়ী ওষুধ দেওয়া হতে পারে। কিছু রোগীর জন্য প্রোপ্রানললের মতো ওষুধ ব্যবহৃত হলেও এটি সবার জন্য উপযুক্ত নয়। পারকিনসন রোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও নিয়মিত ফলোআপ প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত খাবার গ্রহণ, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা উপকারী। তবে দীর্ঘস্থায়ী কাঁপুনিকে শুধু দুর্বলতা ভেবে অবহেলা না করে সঠিক কারণ নির্ণয় করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন