নওগাঁ জেলা প্রতিনিধিঃ শ্রী সুদাম চন্দ্র
নিজ দলের সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রবিউল আলম বুলেট। একই সঙ্গে মহাদেবপুরে বিএনপির নামে আলাদা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে কার্যালয় পরিচালনার অভিযোগ তুলে আগামী ৭ নভেম্বরের কর্মসূচির পর সেটি খুলে ফেলে দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
অভিযোগের মুখে থাকা সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল নওগাঁ-৩ (মহাদেবপুর-বদলগাছী) আসনের প্রতিনিধি। তাঁর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতির এমন বক্তব্য ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি রবিউল আলম বুলেটের একটি বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
এমপির বিরুদ্ধে ব্যাংক ড্রাফট ও খাদ্য গুদারের অর্থ নিয়ে অভিযোগ
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে রবিউল আলম বুলেট দাবি করেন, গত আট থেকে নয় মাসে সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুলের বিরুদ্ধে ব্যাংক ড্রাফট এবং খাদ্য গুদাম থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও ব্যাংক ড্রাফটের নম্বর সংগ্রহ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে উপস্থাপন করবেন বলেও জানান তিনি।
বুলেটের বক্তব্য অনুযায়ী, কোন ব্যাংক থেকে কত টাকার ড্রাফট হয়েছে এবং সেসব অর্থ কোথায় জমা হয়েছে, তার বিস্তারিত হিসাব তুলে ধরা হবে। মহাদেবপুর এলাকায় ব্যাংক ড্রাফটসংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা প্রমাণ প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা তাঁর বক্তব্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিএনপির নামে আলাদা কার্যালয়ের সাইনবোর্ড সরানোর ঘোষণা
ভিডিওতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি অভিযোগ করেন, মহাদেবপুরে বিএনপির নামে আলাদা সাইনবোর্ড ব্যবহার করে একটি কার্যালয় পরিচালনা করা হচ্ছে। আগামী ৭ নভেম্বরের কর্মসূচি শেষে ওই সাইনবোর্ড খুলে ফেলে দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
বুলেট বলেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নেতা-কর্মীদের সুসংগঠিত থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে রাজনীতি করার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা অনুসরণ করেই তাঁরা এতদিন চলেছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এতদিন অনেক বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেননি বলেও দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া বিভিন্ন ইউনিয়নে চিঠি দিয়ে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগের জবাব জনগণের সামনে দেওয়া হবে বলে জানান বুলেট। কোন ইউনিয়নের কাছে বিএনপি টাকা চেয়েছে এবং সংসদ সদস্য কার কাছে টাকা চেয়েছেন, সেসব তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ করার কথাও বলেন তিনি।
সংসদ সদস্যের বক্তব্য ও প্রশাসন নিয়ে সমালোচনা
ভিডিওতে সংসদ সদস্যের সমালোচনা করতে গিয়ে রবিউল আলম বুলেট অতীতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদাহরণ টানেন। তাঁর বক্তব্য, প্রশাসন, পুলিশ বা অন্যান্য ক্ষমতাকাঠামো থাকলেও শেষ পর্যন্ত জনগণের সমর্থনই গুরুত্বপূর্ণ।
এ সময় তিনি সংসদ সদস্যের একজন প্রতিনিধিকে ঘিরে একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, ওই প্রতিনিধি গ্রেপ্তারের মুখে পড়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ক্ষমা চান। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বা ঘটনার স্বাধীন সত্যতা ভিডিওর বক্তব্যে পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া সংসদ সদস্যের একটি টকশোতে দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করেন বুলেট। সেখানে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে তিন কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগসংক্রান্ত বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন করেন, অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন।
খাদ্য গুদাম থেকে তিন কোটি টাকা নেওয়ার দাবি
সাবেক সংসদ সদস্য সেলিমের সময়ের সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনা করে বুলেট দাবি করেন, গত আট থেকে নয় মাসে দুর্নীতির পরিমাণ আগের পাঁচ বছরের চেয়েও বেশি হয়েছে বলে তাঁর ধারণা।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, একটি খাদ্য গুদাম থেকেই তিন কোটি টাকার বেশি অর্থ নেওয়া হয়েছে। কোনো কাজ সম্পন্ন না করেই কীভাবে কাজের বিল তোলা হয়েছে, তার হিসাবও যথাসময়ে জনগণের সামনে প্রকাশ করবেন বলে জানান তিনি।
এদিকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওর বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে রবিউল আলম বুলেট বলেন, এ বিষয়ে সময়মতো কথা বলবেন।
অভিযোগ অস্বীকার করেন সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল বলেন, তিনি কোনো অন্যায় করেননি। অভিযোগকারীর কাছে প্রমাণ থাকলে তা উপস্থাপনের আহ্বান জানান তিনি।
বাবুল আরও বলেন, রাজনীতিতে থাকলে নানা ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগ আসতে পারে। বর্তমানে তথ্যপ্রবাহ উন্মুক্ত থাকায় কোনো কিছু লুকানোর সুযোগ নেই। কারও কাছে অডিও বা বক্তব্যের প্রমাণ থাকলে তা জাতির সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
সংসদ সদস্যের ভাষ্য, তিনি রাজনীতিতে নতুন নন। তাই এ ধরনের বক্তব্যকে রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবেই দেখছেন। সাংবাদিকদেরও স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নওগাঁ জেলা বিএনপির সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক নান্নুকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
নিজ দলের সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে উপজেলা বিএনপি সভাপতির প্রকাশ্য অভিযোগ, ব্যাংক ড্রাফট ও খাদ্য গুদামসংক্রান্ত দাবি এবং দলীয় কার্যালয়ের সাইনবোর্ড সরানোর ঘোষণা ঘিরে নওগাঁর মহাদেবপুরে রাজনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন