দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য থাইল্যান্ড। মনোরম সমুদ্রসৈকত, দৃষ্টিনন্দন দ্বীপ, বৌদ্ধ মন্দির, সুস্বাদু খাবার ও প্রাণবন্ত রাতের জীবনের আকর্ষণে প্রতিবছর দেশটিতে ভিড় করেন লাখো পর্যটক। তবে দেশটিতে ভ্রমণের আগে কিছু আইন ও বিধিনিষেধ সম্পর্কে জানা পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কারণ, নিজের দেশে স্বাভাবিক এমন কোনো কাজ থাইল্যান্ডে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ভিসার মেয়াদ অতিক্রম, নিষিদ্ধ ই-সিগারেট বহন কিংবা মন্দিরে অনুপযুক্ত পোশাকের কারণে পর্যটকেরা বড় ধরনের আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন।

তাই থাইল্যান্ড ভ্রমণের আগে জেনে নিন পর্যটকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ১০টি কড়া নিয়ম:

১. ভিসা ও অবস্থানের মেয়াদ অতিক্রম করবেন না

থাইল্যান্ডে প্রবেশের ভিসার মেয়াদ এবং দেশটিতে থাকার অনুমোদিত সময় এক বিষয় নয়। প্রবেশের সময় পাসপোর্টে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা যে শেষ তারিখ উল্লেখ করেন, সেটিই মেনে চলতে হবে। অনুমোদিত সময়ের বেশি অবস্থান করলে প্রতিদিন ৫০০ বাথ জরিমানা হতে পারে, যার সর্বোচ্চ পরিমাণ ২০ হাজার বাথ। দীর্ঘ সময় অবৈধভাবে থাকলে এক থেকে ১০ বছর পর্যন্ত থাইল্যান্ডে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাসহ গ্রেফতারের ঝুঁকি রয়েছে।

২. কাস্টমসের নিয়ম না জেনে পণ্য বহন করবেন না

থাইল্যান্ডে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট শর্তে সর্বোচ্চ ২০ হাজার বাথ মূল্যমানের পণ্য শুল্কমুক্তভাবে নেওয়া যায়। এছাড়া ২০ হাজার মার্কিন ডলার বা তার বেশি সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা বহন করলে কাস্টমসে ঘোষণা দিতে হয়। নিষিদ্ধ পণ্য যেমন মাদক, ই-সিগারেট, অস্ত্র বা অনুমতি ছাড়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বহনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

থাইল্যান্ডের একটি মনোমুগ্ধকর সমুদ্রসৈকত ও পাহাড়ি দ্বীপের দৃশ্য
থাইল্যান্ডের একটি মনোমুগ্ধকর সমুদ্রসৈকত ও পাহাড়ি দ্বীপের দৃশ্য। ছবিঃ সংগৃহীত

৩. প্রেসক্রিপশনের ওষুধেও থাকতে পারে বিধিনিষেধ

নিজ দেশে বৈধ কোনো ওষুধ থাইল্যান্ডেও বৈধ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আলপ্রাজোলাম, ডায়াজেপাম ও জোলপিডেমের মতো নির্দিষ্ট ওষুধের ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম রয়েছে। তাই ওষুধ মূল প্যাকেটে রাখুন, চিকিৎসকের ইংরেজি প্রেসক্রিপশন সঙ্গে নিন এবং ভ্রমণের আগে থাই এফডিএর (FDA) নির্দেশনা যাচাই করুন।

৪. পাসপোর্টের কপি ও ডিজিটাল ব্যাকআপ রাখুন

থাইল্যান্ডে অবস্থানকালে প্রতিদিন ঘোরাঘুরির সময় মূল পাসপোর্ট সঙ্গে রাখলে হারানো বা চুরির ঝুঁকি থাকে। তাই পাসপোর্টের তথ্যসংবলিত পাতা, ভিসা ও প্রবেশের সিলের ফটোকপি এবং ডিজিটাল কপি সঙ্গে রাখুন।

৫. রাজপরিবার নিয়ে মন্তব্যে সতর্ক থাকুন

থাইল্যান্ডের রাজপরিবারের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। দেশটির ফৌজদারি আইনের ১১২ ধারায় রাজা, রানি বা উত্তরাধিকারীকে অপমান করার অপরাধে ৩ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর পোস্ট করা থেকে বিরত থাকুন।

৬. মন্দিরে পোশাক ও আচরণে শালীনতা বজায় রাখুন

মন্দিরে প্রবেশের সময় কাঁধ ও হাঁটু ঢাকা পোশাক পরা উচিত, অতিরিক্ত আঁটসাঁট পোশাক এড়িয়ে চলুন। বসার সময় পায়ের তলা বুদ্ধমূর্তি বা ভিক্ষুদের দিকে রাখবেন না। বিশেষ করে গ্র্যান্ড প্যালেস ও ওয়াট ফ্রা কায়েওতে পোশাকের নিয়ম বেশ কঠোর।

৭. অ্যালকোহল কেনা ও পান করার নিয়ম জানুন

থাইল্যান্ডে সাধারণভাবে সকাল ১১টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত অ্যালকোহল কেনা যায়। মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস ও নির্দিষ্ট গণপরিবহন এলাকায় অ্যালকোহল পান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো থেকেও বিরত থাকতে হবে।

৮. ই-সিগারেট ও ভ্যাপিং ডিভাইস সঙ্গে নেবেন না

থাইল্যান্ডে ই-সিগারেট ও ভ্যাপিং পণ্য আমদানি এবং বহনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নিষিদ্ধ পণ্য বহনের ক্ষেত্রে জব্দ, জরিমানা এবং সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে। তাই ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য হলেও এসব পণ্য নেওয়া উচিত নয়।

৯. গাঁজা ব্যবহারে রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ

চিকিৎসার প্রয়োজনে গাঁজা ব্যবহার করতে হলে থাইল্যান্ডের অনুমোদিত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন প্রয়োজন। অনুমতি ছাড়া গাঁজা কেনা, বহন বা জনসমক্ষে সেবনের জন্য জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

১০. নির্দিষ্ট সমুদ্রসৈকতে ধূমপান নিষিদ্ধ

পরিবেশ রক্ষায় থাইল্যান্ডের ফুকেটের পাটং, পাতায়ার বিচ ও জেমতিয়েনসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় সৈকতে ধূমপান করা যায় না। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সর্বোচ্চ এক লাখ বাথ জরিমানা, এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড কিংবা উভয় শাস্তি হতে পারে।

বিদেশ ভ্রমণ হতে পারে দারুণ এক অভিজ্ঞতা। তবে বিদেশে গেলে নিজের দেশের নিয়ম নয়, গন্তব্য দেশের আইন ও সংস্কৃতিকে সম্মান করাই সবচেয়ে জরুরি। ভ্রমণের আগে এসব বিধিনিষেধ সম্পর্কে জেনে নিলে অপ্রত্যাশিত জরিমানা ও আইনি জটিলতা এড়িয়ে নিশ্চিন্তে ছুটি উপভোগ করা যাবে।