দীপাবলিতে আতশবাজি পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ ও বায়ুদূষণ কমাতে জনসচেতনতামূলক প্রচার চালিয়েছিল ভারতের বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা। সেই প্রচারের অংশ হিসেবে ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন বলিউড অভিনেত্রী দিয়া মির্জাসহ একাধিক তারকা। কিন্তু বিজেপি ও শিবসেনার কয়েকজন নেতার আপত্তির পর পৌরসভার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে দিয়ার ভিডিও। এ ঘটনায় ভারতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বম্বে হাইকোর্টের নির্দেশনার পর দূষণ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা বাড়াতে পরিচিত ব্যক্তিদের যুক্ত করার উদ্যোগ নেয় বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা। তাদের অনুরোধেই বিনা পারিশ্রমিকে ভিডিও বার্তা দেন দিয়া মির্জা। একই প্রচারে অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিত, ক্রিকেটার অজিঙ্কা রাহানে এবং মারাঠি অভিনেত্রী নিশিগন্ধা ওয়াডেরও অংশ নেন।

তবে অন্য তারকাদের ভিডিও বহাল থাকলেও দিয়ার ভিডিওটি সরিয়ে দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, কেন শুধু তাঁর বার্তার ক্ষেত্রেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?

কী বলেছিলেন দিয়া মির্জা?

দিয়া মির্জা দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশ ও দূষণবিরোধী বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। পৌরসভার প্রচারে তাঁর বার্তায় উৎসবের সময় বায়ুদূষণ কমানো এবং মানুষের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছিল।

দিয়ার পারিবারিক পরিচয় নিয়েও বিতর্কের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। তাঁর বাবা জার্মান বংশোদ্ভূত খ্রিষ্টান এবং মা বাঙালি হিন্দু। পরে মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর সৎবাবা আহমেদ মির্জার পদবি গ্রহণ করেন দিয়া।

বিজেপি নেতার আপত্তির পর শুরু বিতর্ক

বিজেপির মুম্বাই শাখার সভাপতি অমিত সাটম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পৌরসভাকে উদ্দেশ করে লেখেন, দীপাবলি কীভাবে উদ্‌যাপন করতে হবে, সে বিষয়ে দিয়া মির্জার কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও কয়েকজন ব্যবহারকারী দিয়ার ভিডিওর বিরোধিতা করেন। পরবর্তী সময়ে পৌরসভার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ভিডিওটি সরিয়ে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ভিডিও সরানোর বিষয়ে বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি।

পৌরসভার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য

মুম্বাইয়ের মেয়র রীতু তাওড়ে দাবি করেন, ভিডিও সরানোর সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর বক্তব্য, দিয়া মির্জা অতীতে বিভিন্ন বিষয়ে হিন্দুত্ববিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। তাই পৌরসভার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বার্তা রাখা উচিত নয় বলে মনে করা হয়েছে।

অন্যদিকে, পৌরসভার এক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, বম্বে হাইকোর্টের নির্দেশনা মেনেই দূষণবিরোধী প্রচার চালানো হয়েছিল। জনরোষের কারণে একজনের ভিডিও সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যেও ভিন্নমত

বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের শরিক রিপাবলিকান পার্টির নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আটওয়ালে এ বিষয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, দীপাবলি উদ্‌যাপনের অধিকার সব ধর্মের মানুষের রয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত বায়ুদূষণ নিয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।

শিবসেনার মুখপাত্র শায়না এনসি বলেন, দীপাবলি আলোর উৎসব এবং এর সঙ্গে মানুষের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আবেগ জড়িত। তাঁর মতে, উৎসবের বিষয়ে বাইরের কারও কাছ থেকে উপদেশ নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

অন্যদিকে, এআইএমআইএমের মুখপাত্র ওয়ারিশ পাঠান প্রশ্ন তোলেন, একই ধরনের দূষণবিরোধী বার্তা দেওয়া অন্য তারকাদের ভিডিও সরানো না হলেও শুধু দিয়ার ভিডিও কেন সরানো হলো?

হতাশা প্রকাশ করেছেন দিয়া মির্জা

নিজের ভিডিও সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেন দিয়া মির্জা। তাঁর বক্তব্য, বম্বে হাইকোর্টের নির্দেশনার পর বৃহন্মুম্বাই পৌরসভাই তাঁকে ভিডিওটি তৈরি করতে অনুরোধ করেছিল। তিনি কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই জনস্বার্থে কাজটি করেছিলেন।

দিয়া আরও বলেন, বায়ুদূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। দূষণ কমানোর চেষ্টা সবারই করা উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি লেখেন, ভালো কাজের দিন যেন আর নেই।

দিয়ার ভিডিও সরানোর ঘটনাটি তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর বক্তব্য ঘিরে বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং জনস্বাস্থ্য, ধর্মীয় অনুভূতি, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জনসচেতনতামূলক প্রচারের নিরপেক্ষতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।