হীরা মানেই মূল্যবান রত্ন। সাধারণত গয়না কিংবা দামি অলংকারে এর ব্যবহার দেখা যায়। কিন্তু জার্মানির এমন একটি শহর রয়েছে, যার বাড়িঘর, ঐতিহাসিক স্থাপনা এমনকি গির্জার দেয়ালেও মিশে আছে অসংখ্য ক্ষুদ্র হীরা! অবাক করা বিষয় হলো, এসব হীরা কোনো খনি থেকে তোলা হয়নি। প্রায় দেড় কোটি বছর আগে একটি গ্রহাণুর আঘাতেই তৈরি হয়েছিল এই হীরার উৎস।
শহরটির নাম নর্ডলিঙ্গেন। জার্মানির ব্যাভারিয়া অঞ্চলে অবস্থিত এই শহরটি গড়ে উঠেছে প্রাচীন এক গ্রহাণুর আঘাতে সৃষ্ট বিশাল গহ্বরের মধ্যে। গবেষকদের ধারণা, পুরো নর্ডলিঙ্গেন ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৭২ হাজার টন ক্ষুদ্র হীরা রয়েছে। তবে আকারে অত্যন্ত ছোট হওয়ায় এগুলোর বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় নেই বললেই চলে।
কীভাবে তৈরি হলো হীরায় ভরা এই শহর?
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ১৫ মিলিয়ন বা দেড় কোটি বছর আগে বর্তমান জার্মানির দক্ষিণাঞ্চলে একটি গ্রহাণু আছড়ে পড়ে। প্রচণ্ড গতিতে আঘাত হানার ফলে সৃষ্টি হয় বিশাল গহ্বর। সেই সংঘর্ষের তীব্র তাপ ও চাপে আশপাশের শিলায় নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে। তৈরি হয় সুয়েভাইট নামের বিশেষ এক ধরনের শিলা।
সুয়েভাইটের মধ্যে রয়েছে কাচের মতো পদার্থ, বিভিন্ন খনিজ উপাদান এবং ক্ষুদ্র হীরার কণা। গ্রহাণুর আঘাতের সময় সৃষ্ট প্রচণ্ড চাপের কারণে শিলার কার্বন উপাদান থেকে এসব ক্ষুদ্র হীরা তৈরি হয়েছিল।
গির্জার দেয়ালে প্রায় ৫ হাজার ক্যারেট হীরা!
নর্ডলিঙ্গেনের সবচেয়ে পরিচিত স্থাপনাগুলোর একটি হলো সেন্ট জর্জেস চার্চ। ১৫ শতকে নির্মিত এই ঐতিহাসিক গির্জার নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছিল সুয়েভাইট পাথর।
গবেষক ও স্থানীয় ভূতত্ত্ববিদদের হিসাব অনুযায়ী, গির্জাটিতে প্রায় ৫ হাজার ক্যারেট হীরা থাকতে পারে। তবে এগুলো সাধারণ হীরার মতো বড় বা খালি চোখে সহজে দেখা যায় না। কোনো কোনো হীরার আকার মাত্র ০.৩ মিলিমিটার পর্যন্ত। ফলে এগুলো দেখতে সাধারণত মাইক্রোস্কোপের প্রয়োজন হয়।
শহরজুড়ে ছড়িয়ে আছে প্রায় ৭২ হাজার টন হীরা!
নর্ডলিঙ্গেন শহর ও এর আশপাশের এলাকায় প্রায় ৭২ হাজার টন ক্ষুদ্র হীরা থাকার একটি বহুল প্রচলিত বৈজ্ঞানিক অনুমান রয়েছে। স্থানীয় নির্মাণকাজে সুয়েভাইট পাথর ব্যবহারের কারণে শহরের বিভিন্ন পুরোনো স্থাপনার দেয়ালেও এসব হীরার কণা মিশে রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক জার্মান সংবাদমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে নর্ডলিঙ্গার রিজ অঞ্চলে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ কেজি বা ১৩ হাজার টন হীরার হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। হিসাবের পার্থক্যটি নির্ভর করে কোন এলাকা ও কত পরিমাণ শিলাকে গণনার আওতায় আনা হচ্ছে, তার ওপর।
হীরা থাকলেও কেন নেই অর্থনৈতিক মূল্য?
শহরজুড়ে এত হীরা থাকার কথা শুনে মনে হতে পারে, এখানকার বাসিন্দারা হয়তো বিপুল সম্পদের মালিক। বাস্তবে বিষয়টি একেবারেই আলাদা। এসব হীরা এতটাই ক্ষুদ্র যে এগুলো গয়না তৈরির কাজে ব্যবহার করা যায় না। বেশির ভাগ কণা মাইক্রোস্কোপ ছাড়া দেখাও কঠিন।
তাই নর্ডলিঙ্গেনের হীরা অর্থনৈতিক সম্পদের চেয়ে ভূতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক বিস্ময় হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যযুগীয় দেয়ালে ঘেরা ঐতিহাসিক শহর
হীরার পাশাপাশি নর্ডলিঙ্গেনের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হলো এর মধ্যযুগীয় স্থাপত্য। শহরটির প্রথম জনবসতি গড়ে ওঠে ৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে। পরে মধ্যযুগে নিরাপত্তার জন্য শহরের চারপাশে প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল নির্মাণ করা হয়।
আজও শহরটির ঐতিহাসিক দেয়ালের বড় অংশ অক্ষত রয়েছে। ফলে প্রাচীন স্থাপত্য, ইতিহাস এবং বিরল ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে নর্ডলিঙ্গেন পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য।
একটি গ্রহাণুর আঘাত কীভাবে লাখ লাখ বছর পর মানুষের বসতি, স্থাপত্য ও ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠতে পারে, নর্ডলিঙ্গেন তারই এক বিস্ময়কর উদাহরণ।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন