কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে দ্রুত তৈরি হচ্ছে ডেটা সেন্টার। তবে প্রযুক্তির এই সম্প্রসারণের জন্য প্রকৃতির কতটা ক্ষতি হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ফিনল্যান্ডে গুগলের দুটি পরিকল্পিত ডেটা সেন্টার প্রকল্প ঘিরে তৈরি হয়েছে এমনই বিতর্ক। অভিযোগ, প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজের অংশ হিসেবে প্রায় চার লাখ গাছ কাটা হয়েছে। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন সম্পন্ন না হওয়ায় দেশটির কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে দুটি স্থানে পরিবেশের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে এমন কাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বন উজাড়, পানির প্রবাহে পরিবর্তন এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা। এর মধ্যে মুহোস এলাকার প্রকল্পের কাজ নিয়ে সম্ভাব্য পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগে পুলিশ প্রাথমিক তদন্তও শুরু করেছে।
মুহোস ও ওটানমাকিতে বন পরিষ্কারের অভিযোগ
ফিনল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে মুহোস শহরের কাছে প্রায় ৩৩০ হেক্টর জমিতে একটি ডেটা সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা করেছে গুগল। একই বিনিয়োগ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কাজ চলছে কাজানি শহরের ওটানমাকি এলাকাতেও।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও পরিবেশকর্মীদের হিসাবে, মুহোস এলাকায় প্রায় আড়াই লাখ এবং ওটানমাকি এলাকায় আরও দেড় লাখ গাছ কাটা হয়েছে। সব মিলিয়ে গাছ কাটার সংখ্যা চার লাখের কাছাকাছি বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এই সংখ্যা কর্তৃপক্ষের চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হিসাব নয়।
গাছ কাটার পাশাপাশি প্রকল্পের জন্য মাটির ওপরের স্তর সরানো, জমি সমতল করা, রাস্তা তৈরি এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার কাজও হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কার্যক্রমের ফলে একসময়ের সবুজ বনাঞ্চলের বড় অংশের প্রাকৃতিক চেহারা বদলে গেছে।
পরিবেশগত মূল্যায়ন শেষ হওয়ার আগেই কাজ, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ
ফিনল্যান্ডের লাইসেন্সিং অ্যান্ড সুপারভিশন অথরিটি (LVV) ৬ অক্টোবর ২০২৬ মুহোস ও কাজানি-ওটানমাকি প্রকল্পে পরিবেশের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে এমন প্রস্তুতিমূলক কাজ বন্ধের নির্দেশ দেয়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, দুটি প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বা EIA প্রক্রিয়া তখনো সম্পন্ন হয়নি। অথচ এর আগেই গাছ কাটা, মাটির ওপরের স্তর সরানো, খনন, পানি নিষ্কাশনের নালা পরিবর্তন এবং নির্মাণসামগ্রী রাখার জায়গা তৈরির মতো কাজ শুরু হয়েছিল।
নির্দেশ অনুযায়ী, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের কাজ বন্ধ রাখতে হবে। তবে পরিকল্পনা, জরিপ, মাটি পরীক্ষা এবং সহজে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া যায় এমন সীমিত কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
গুগলের স্থানীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠান টুইকে ফিনল্যান্ড জানিয়েছে, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতিমূলক কাজ বন্ধ করা হয়েছে। গুগলও জানিয়েছে, তারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করবে।
পানিদূষণ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নিয়ে উদ্বেগ
মুহোস এলাকার বনাঞ্চল পরিষ্কার ও জমির পরিবর্তনের কারণে স্থানীয় জলাধার এবং ওলুজোকি নদীর পানি দূষিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন পরিবেশকর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, বনাঞ্চল থেকে বাদামি রঙের পানি আশপাশের জলপথে মিশছে। এতে স্থানীয় জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বন ধ্বংসের ফলে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থলও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ওটানমাকি এলাকায় নেকড়ে লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসার ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া তিন-আঙুলের কাঠঠোকরার মতো পাখির আবাসস্থল নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদেরা।
তবে এসব পরিবেশগত ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন ও তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগে পুলিশের তদন্ত
মুহোস এলাকার প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজ নিয়ে সম্ভাব্য পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগে ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর ফিনল্যান্ডের ওউলু পুলিশ বিভাগ প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে।
কর্তৃপক্ষের কাছে জমা পড়া অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তটি শুরু হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্প এলাকায় পানি নিষ্কাশন ও পানি ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম বা ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে পরিবেশগত ক্ষতির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইনের সম্ভাব্য লঙ্ঘনের বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে।
তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। ফলে গুগল বা তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
দুঃখ প্রকাশ করেছে গুগল
বন পরিষ্কারের ঘটনা নিয়ে সমালোচনার মুখে গুগলের ফিনল্যান্ড শাখার পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ওই পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের নির্ধারিত উচ্চ মান বজায় রাখতে পারেনি।
গুগলের বক্তব্য অনুযায়ী, তৎকালীন আইনি পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের বোঝাপড়ার ভিত্তিতে প্রস্তুতিমূলক কাজ করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি পরিবেশগত জরিপ পরিচালনা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক এলাকা সুরক্ষার ব্যবস্থাও নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
মুহোস এলাকায় প্রায় ১৩০ হেক্টর জমিতে নতুন গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে গুগল। তবে পরিবেশকর্মীদের একাংশের মতে, এত বড় বনাঞ্চল হারানোর ক্ষতি পূরণে এই উদ্যোগ যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এআইয়ের উন্নয়ন নাকি পরিবেশের ক্ষতি?
ফিনল্যান্ডে গুগলের ডেটা সেন্টার প্রকল্প দেশটিতে বড় প্রযুক্তি বিনিয়োগের অংশ। ঠান্ডা আবহাওয়া, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং জমির প্রাপ্যতার কারণে দেশটি ডেটা সেন্টার নির্মাণের জন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
গুগলের বিনিয়োগের ফলে কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি খাতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরিবেশের ওপর এর প্রভাবও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এআই পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল কম্পিউটিং সক্ষমতা, বিদ্যুৎ এবং শীতলীকরণ ব্যবস্থা। ফলে ডেটা সেন্টার নির্মাণের আগে বন, পানি, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
ফিনল্যান্ডের এই ঘটনা প্রযুক্তি উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে: এআইয়ের ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে প্রকৃতির ক্ষতি কতটা গ্রহণযোগ্য? বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া না হলে প্রযুক্তির অগ্রগতির মূল্য দিতে হতে পারে স্থানীয় মানুষ ও প্রকৃতিকেই।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন