দিল্লির এক তরুণ থেকে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটার- বিরাট কোহলির পথচলাটা যেন অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস আর রেকর্ড ভাঙার গল্প। ব্যাট হাতে ধারাবাহিকতা, অসাধারণ ফিটনেস এবং চাপের মুখে দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। জন্মদিনে ‘চেজ মাস্টার’ থেকে ‘কিং কোহলি’ হয়ে ওঠা এই তারকার চারটি স্মরণীয় ইনিংস ফিরে দেখা যাক।
১. হোবার্টে ১৩৩ রানের অপরাজিত ইনিংস (২০১২)
কোহলির ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ইনিংসগুলোর একটি ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হোবার্টে। ৩২১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ৮৬ বলে ১৩৩ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। তাঁর ব্যাটিংয়ে ভারত ৩৬.৪ ওভারেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। বিশেষ করে লাসিথ মালিঙ্গার এক ওভারে ২৪ রান নেওয়ার দৃশ্যটি ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল। এই ইনিংস কোহলির রান তাড়া করার দক্ষতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
২. পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৮৩ রানের মহাকাব্য (২০১২)
একই বছরের এশিয়া কাপে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিপক্ষে নিজের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ইনিংস খেলেন কোহলি। ঢাকায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে পাকিস্তানের ৩৩০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৪৮ বলে ১৮৩ রান করেন তিনি। ইনিংসে ছিল ২২টি চার ও একটি ছক্কা। শুরুতেই গৌতম গম্ভীরের বিদায়ের পর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে দলকে জয়ের পথে এগিয়ে নেন কোহলি। তাঁর এই ইনিংস শুধু ম্যাচ জেতায়নি, বড় লক্ষ্য তাড়া করার ক্ষেত্রে তাঁর সামর্থ্যও প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
৩. অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মোহালিতে ৮২ রানের ইনিংস (২০১৬)
২০১৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মোহালির ম্যাচটি ছিল ভারতের জন্য বাঁচা-মরার লড়াই। ১৬১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই চাপে পড়ে ভারত। একপর্যায়ে ৪৯ রানে তিন উইকেট হারিয়ে দল যখন কঠিন পরিস্থিতিতে, তখন হাল ধরেন কোহলি। মাত্র ৫১ বলে ৮২ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। শেষ দিকে ১৮ বলে ৩৯ রানের প্রয়োজন হলে কোহলির ব্যাটিংয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে চলে আসে। তাঁর এই অসাধারণ পারফরম্যান্স ভারতকে সেমিফাইনালে পৌঁছানোর পথ তৈরি করে দেয়।
৪. পাকিস্তানের বিপক্ষে মেলবোর্নে অবিশ্বাস্য জয় (২০২২)
২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে মেলবোর্নের ম্যাচটি কোহলির ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। ১৬০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ৩১ রানে চার উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে ভারত। সেখান থেকে হার্দিক পান্ডিয়ার সঙ্গে জুটি গড়ে ম্যাচে ফেরেন কোহলি। শেষ পর্যন্ত ৫৩ বলে ৮২ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। বিশেষ করে হারিস রউফের বলে তাঁর দুটি দুর্দান্ত ছক্কা ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। শেষ বলে ভারতের নাটকীয় জয়ের পর কোহলির আবেগঘন উদযাপনও ছড়িয়ে পড়ে ক্রিকেটবিশ্বে।
এই চারটি ইনিংস কোহলির ব্যাটিংয়ের ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরে। কখনো বড় লক্ষ্য তাড়া করে জয় এনে দেওয়া, কখনো প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণকে শাসন করা, আবার কখনো কঠিন পরিস্থিতিতে দলকে টেনে তোলা—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। শচীন টেন্ডুলকারের ওয়ানডে সেঞ্চুরির রেকর্ড পেরিয়ে ৫০টি শতকের মাইলফলক স্পর্শ করাও তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন। ২০১১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ ও ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি।
কোহলির ক্যারিয়ারে উত্থান-পতন এসেছে, ফর্ম নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। কিন্তু প্রতিবারই নিজের ব্যাটিং ও পরিশ্রম দিয়ে সমালোচনার জবাব দিয়েছেন তিনি। আগ্রাসী মনোভাব, ফিটনেসের প্রতি নিষ্ঠা এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তাঁকে কোটি ভক্তের কাছে বিশেষ করে তুলেছে। জন্মদিনে তাঁর এই চার ইনিংস তাই শুধু কিছু রান বা জয়ের পরিসংখ্যান নয়, বরং বড় মঞ্চে চাপ সামলে নিজেকে প্রমাণ করার গল্প।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন