ক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় ধরনের পালাবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টির হাত থেকে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের কাছে। এর ফলে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আসছে ওয়াশিংটনে। প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়েও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি বাধার মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প।

এবারের নির্বাচনে ভোটারদের অসন্তোষের বড় কারণ হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক চাপ ও সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত। ইরান যুদ্ধের প্রভাব, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, শুল্ক আরোপ এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জরিপেও ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি সমর্থন কমার চিত্র দেখা যায়। ভোটের ফলাফলে সেই অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ৪৩৫ সদস্যের এই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন। প্রতিবেদনে দেওয়া সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছেন ২২৫টি আসন। বিপরীতে রিপাবলিকানদের ঝুলিতে রয়েছে ১৩৮টি। তখনো ৭৩টি আসনের ফল ঘোষণা বাকি ছিল। অর্থাৎ সব ফল প্রকাশের আগেই নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে ফেলেছে বিরোধী দল।

সিনেটের চিত্রও রিপাবলিকানদের অনুকূলে যায়নি। ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষে এবারের নির্বাচনে ৩৫টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ প্রাপ্ত হিসাবে ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা ৫৪ এবং রিপাবলিকানদের ৪৪। নির্বাচনের আগে এই কক্ষে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। স্বতন্ত্র দুই সিনেটরের সমর্থনও ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে থাকায় উচ্চকক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দলটির অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে।

কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর অর্থ, এখন থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আইন পাস ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ হবে না। ডেমোক্র্যাটরা চাইলে প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারবেন। প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠজন ও পরিবারের সদস্যদের কর্মকাণ্ডও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। এ ছাড়া সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে ট্রাম্পের মনোনীত ব্যক্তিদের অনুমোদন আটকে দেওয়ার সুযোগ থাকবে বিরোধীদের হাতে।

এই ফলকে ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রতি জনগণের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। চ্যাথাম হাউসের গবেষক লরেল র‍্যাপের মতে, আগামী দুই বছর নীতি বাস্তবায়নে ট্রাম্পকে নতুন রাজনৈতিক বাধার মুখোমুখি হতে হবে। তবে পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক বাহিনী মোতায়েন এবং যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রেসিডেন্টের হাতে এখনো উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ কংগ্রেসে বিরোধীদের শক্ত অবস্থান তৈরি হলেও ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা পুরোপুরি সীমিত হয়ে যাচ্ছে না।

কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন ভোটাররা

রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে অর্থনৈতিক অসন্তোষকে অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার যে প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর সঙ্গে ইরান যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা যুক্ত হয়ে সরকারের প্রতি অসন্তোষ আরও বাড়িয়েছে।

ট্রাম্প পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে সরকারি নীতির সুবিধা নিয়ে সম্পদ বাড়ানোর অভিযোগও নির্বাচনী প্রচারে আলোচনায় ছিল। ডেমোক্র্যাটরা এসব বিষয়কে সামনে এনে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে নিজ দলের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। তাঁর সমর্থন পাওয়া কয়েকজন প্রার্থী শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি।

ভোটারদের মনোভাব বুঝতে বুথফেরত জরিপেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। তাঁদের বড় একটি অংশ মনে করেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর নজরদারি ও ভারসাম্য বজায় রাখতে কংগ্রেসকে আরও শক্ত ভূমিকা পালন করতে হবে। নির্বাচনের ফলাফলে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

ডেমোক্র্যাটদের সামনে বড় পরীক্ষা

নির্বাচনে জয় পাওয়ার পর ডেমোক্র্যাটদের সামনে এখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পালা। প্রতিনিধি পরিষদে দলটির নেতা হাকিম জেফ্রিসের স্পিকার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেছেন, ভোটাররা কট্টরপন্থা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও দলীয় নেতাদের সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন।

গভর্নর নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি দলটির রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। পাশাপাশি কয়েকজন প্রার্থীর জয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব সাফল্যের পাশাপাশি ভোটারদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান করাই হবে দলটির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

বিশেষ করে স্বাস্থ্যবিমায় ভর্তুকি পুনর্বহাল, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাম্পের শুল্কনীতি পর্যালোচনার মতো বিষয়গুলো সামনে আসতে পারে। কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় এসব বিষয়ে তদন্ত ও নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছাতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।

পরাজয়ের পর সুর পাল্টালেন ট্রাম্প

নির্বাচনী প্রচারের সময় ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দিয়েছিলেন ট্রাম্প। জনমত জরিপের পূর্বাভাস উপেক্ষা করার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি পরাজয়ের আশঙ্কা নিয়ে ভেটো প্রয়োগের হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন। কিন্তু ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর তাঁর বক্তব্যে নমনীয়তা দেখা যায়। ডেমোক্র্যাটদের বিজয় মেনে নিয়ে দেশের স্বার্থে তাঁদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রতিক্রিয়া এসেছে। স্পেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মেক্সিকোর নেতারা ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফল ওয়াশিংটন ও তেহরানের দীর্ঘদিনের বিরোধে পরিবর্তন আনবে না।

সব মিলিয়ে এই নির্বাচন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ক্ষমতায় থাকার বাকি সময়ে তাঁকে এখন শুধু বিরোধী দলের সমালোচনা নয়, কংগ্রেসের নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গেও সমঝোতা করতে হবে। আর ডেমোক্র্যাটদের জন্যও জয় ধরে রাখার সবচেয়ে বড় উপায় হবে মানুষের অর্থনৈতিক দুর্ভোগ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। নির্বাচনে পাওয়া জনসমর্থন বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দিতে না পারলে তাদের সামনেও নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।