আব্দুল এল-সাঈদের ঐতিহাসিক জয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আব্দুল এল-সাঈদ। মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন তিনি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এই জয়ের মধ্য দিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস গড়লেন ৪২ বছর বয়সী এল-সাঈদ। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাট দলের প্রগতিশীল অংশের জন্যও এটি বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, আব্দুল এল-সাঈদ পেয়েছেন ২২ লাখ ৩৬ হাজার ৮২৪ ভোট। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স পেয়েছেন ১৯ লাখ ৯২ হাজার ১৩৩ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৯১। বড় ব্যবধানে এই জয় এল-সাঈদের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। বিদায়ী ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্স পুনর্নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় মিশিগানের আসনটি নিয়ে দলটির মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। আসনটি রিপাবলিকানদের দখলে যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল। তবে এল-সাঈদের বিজয়ে সেই শঙ্কা দূর হয়েছে।

রাজনীতিতে আসার আগে জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন এল-সাঈদ। নির্বাচনী প্রচারে তিনি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, শ্রমজীবী পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজনীতিতে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রভাব কমানোর প্রতিশ্রুতি দেন। তার প্রচারণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সবার জন্য সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ নামে পরিচিত এই পরিকল্পনার মাধ্যমে সব নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর কথা বলেন তিনি। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ কমানোর প্রতিশ্রুতিও ভোটারদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে।

অন্যদিকে, রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের বয়স ৬৩ বছর। তিনি আগে কংগ্রেস সদস্য এবং এফবিআই এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জোরালো সমর্থন পেয়েছিলেন তিনি। প্রচারণার সময় রজার্স এল-সাঈদকে কট্টরপন্থী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এমনকি তাকে ‘জিহাদি’ আখ্যা দিয়েও প্রচার চালানো হয়। পাশাপাশি মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে এল-সাঈদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি। তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন এল-সাঈদ। তার পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করা হয়।

নির্বাচনী প্রচারে দুই প্রার্থীর মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য ছিল ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি। ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন এল-সাঈদ। এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে রজার্স ইহুদি ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত ভোটারদের কাছে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোই বড় গুরুত্ব পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা এবং সাধারণ পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে রজার্সের প্রচারণা সত্ত্বেও এল-সাঈদের সমর্থন ধরে রাখা সম্ভব হয়।

সব মিলিয়ে আব্দুল এল-সাঈদের জয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে থাকছে। প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে তার নির্বাচিত হওয়া দেশটির প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই সঙ্গে মিশিগানের গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসন ধরে রাখতে পেরেছে ডেমোক্র্যাটরা। নির্বাচনী প্রচারে নানা বিতর্ক, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন এল-সাঈদ। এখন তার সামনে থাকবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং সিনেটে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো তুলে ধরার চ্যালেঞ্জ।