হলিউডে ব্লকবাস্টার সিনেমা তৈরির স্বপ্ন বহুদিনের। ১৯৭৫ সালে স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘জস’ সিনেমা উত্তর আমেরিকার বক্স অফিসে ১০ কোটি ডলারের বেশি আয় করে নতুন ইতিহাস গড়েছিল। সেই থেকে বড় বাজেটের সিনেমা নির্মাণে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে বক্স অফিসে বিপুল আয়। তবে একটি সিনেমা কীভাবে শতকোটি ডলারের ব্যবসা করে, সেই প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর নেই।

ফোর্বসের বিনোদনবিষয়ক লেখক টিম ল্যামারসের বিশ্লেষণ বলছে, সর্বকালের সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমাগুলোর সাফল্যের পেছনে দুটি বিষয় বিশেষভাবে কাজ করেছে - দর্শকের সঙ্গে গল্পের আবেগের সংযোগ এবং পরিচিত চরিত্র ও ফ্র্যাঞ্চাইজির আকর্ষণ।

সর্বকালের সর্বোচ্চ আয় করা ১০ সিনেমা মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে টিকিটের দাম সমন্বয় না করে বিশ্বব্যাপী আয়ের হিসাবে সর্বকালের সেরা ১০ সিনেমার তালিকায় আটটি ছবির আয় ২০০ কোটি ডলারের বেশি। শীর্ষ ১০টি সিনেমা হলো:

  • ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ (২০১৯) - ২৯৪ কোটি ১০ লাখ ডলার

  • ‘অ্যাভাটার’ (২০০৯) - ২৯২ কোটি ৩০ লাখ ডলার

  • ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ (২০২৬) - ২৫১ কোটি ৯০ লাখ ডলার

  • ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’ (২০২২) - ২৩৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার

  • ‘নে ঝা ২’ (২০২৫) - ২২৭ কোটি ডলার

  • ‘টাইটানিক’ (১৯৯৭) - ২২৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার

  • ‘স্টার ওয়ারস: দ্য ফোর্স অ্যাওয়েকেন্স’ (২০১৫) - ২০৭ কোটি ১০ লাখ ডলার

  • ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ইনফিনিটি ওয়ার’ (২০১৮) - ২০৫ কোটি ২০ লাখ ডলার

  • ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’ (২০২১) - ১৯২ কোটি ১০ লাখ ডলার

  • ‘জুটোপিয়া ২’ (২০২৫) - ১৮৭ কোটি ডলার

শীর্ষে ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ ও ‘অ্যাভাটার’-এর রাজত্ব

২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল মুক্তি পাওয়া ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ এখনো বিশ্বব্যাপী সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমার তালিকায় শীর্ষে। ২০১৮ সালের ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ইনফিনিটি ওয়ার’-এর শেষে থানোসের আঙুলের এক চুটকিতে মহাবিশ্বের অর্ধেক প্রাণী বিলীন হয়ে যাওয়ার ঘটনার পাঁচ বছর পরের কাহিনি নিয়ে নির্মিত এন্ডগেম। ২০০৮ সালে আয়রন ম্যান দিয়ে যে গল্পের সূচনা, এক দশকের বেশি সময় ধরে সেই গল্পের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন দর্শকেরা। ফলে প্রিয় চরিত্রগুলোর বিদায়, ত্যাগ ও আবেগঘন পরিণতি দেখতে প্রেক্ষাগৃহে ভিড় করেছিলেন তাঁরা। ২০২৪ সালে মার্ভেল ঘোষণা দেয়, আবারও ফিরছেন অ্যাভেঞ্জাররা-আসছে ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’।

অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম সিনেমার পোস্টার যেখানে আয়রন ম্যান, ক্যাপ্টেন আমেরিকা ও অন্যান্য সুপারহিরোদের দেখা যাচ্ছে
সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যাভাটার’ (২০০৯) সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতাই বদলে দিয়েছিল। কাল্পনিক গ্রহ প্যান্ডোরার পটভূমিতে নির্মিত এই ছবিতে সাবেক সেনাসদস্য জেক সালি সেখানে গিয়ে এক ভিন্ন জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন এবং নাভি জনগোষ্ঠীর সদস্য নেইতিরির প্রেমে পড়েন। শুধু গল্প নয়, ছবিটির ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তি ও চোখধাঁধানো দৃশ্যও দর্শকদের আকৃষ্ট করেছিল। ১৩ বছর পর মুক্তি পাওয়া এর সিক্যুয়েল ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’ বিশ্বব্যাপী ২৩৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার আয় করে। ক্যামেরনের পরিচালনায় ২০০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করা সিনেমার সংখ্যা দাঁড়ায় তিনে—‘টাইটানিক’, ‘অ্যাভাটার’ ও ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’।

চীনা অ্যানিমেশনের চমক ও ব্যতিক্রমী ‘টাইটানিক’

তালিকার পঞ্চম স্থানে থাকা চীনা অ্যানিমেশন সিনেমা ‘নে ঝা ২’ হলিউডের বাইরের ছবি হিসেবে বড় চমক দেখিয়েছে। বিশ্বব্যাপী ২২৭ কোটি ডলার আয়ের প্রায় ২২০ কোটি ৯০ লাখ ডলারই এসেছে দেশটির নিজস্ব বাজার থেকে। হলিউডের বাইরের একটি দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পুরাণভিত্তিক অ্যানিমেশনও যে বিশ্ব বক্স অফিসে বড় সাফল্য পেতে পারে, তার দৃষ্টান্ত এটি।

অন্যদিকে, তালিকার একমাত্র বাস্তব ঐতিহাসিক দুর্ঘটনাভিত্তিক ছবি হলো ‘টাইটানিক’। সুপারহিরো ও ফ্যান্টাসির ভিড়ে শ্রেণিবৈষম্য, প্রেম, বিচ্ছেদ ও মৃত্যুর মতো সর্বজনীন আবেগ ছবিটিকে দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। ১১টি অস্কার জেতা ছবিটি শিল্প ও বাণিজ্য-দুই ক্ষেত্রেই বিরল সাফল্য পেয়েছে।

টাইটানিক সিনেমার একটি আইকনিক দৃশ্যে জ্যাক ও রোজ চরিত্রে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও ও কেট উইন্সলেট
ফ্র্যাঞ্চাইজির বাইরে সম্পূর্ণ মৌলিক গল্প নিয়ে তৈরি হয়েও বিশ্বজুড়ে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছিল ‘টাইটানিক’। ছবি: সংগৃহীত

পরিচিত চরিত্র ও ফ্র্যাঞ্চাইজির দাপট

শীর্ষ ১০ ছবির মধ্যে ‘টাইটানিক’ বাদে বাকি নয়টি সিনেমাই কোনো না কোনো জনপ্রিয় ঘরানা বা আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত ফ্র্যাঞ্চাইজির অংশ। এর মধ্যে চারটি ছবিই সুপারহিরো ঘরানার। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ নতুন গল্প ও চরিত্র নিয়ে ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে প্রতিষ্ঠিত ফ্র্যাঞ্চাইজির নতুন কিস্তি নির্মাণ তুলনামূলক নিরাপদ বলে মনে করে। তবে শুধু পরিচিতি থাকলেই সাফল্য আসে না, দর্শকের সঙ্গে গল্পের আবেগের সংযোগও জরুরি।

সুপারহিরো সিনেমায় ক্লান্তি ও হলিউডের আশা

‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ মুক্তির পর সুপারহিরো সিনেমা নিয়ে দর্শকের আগ্রহে ভাটা পড়তে শুরু করে, যা ‘সুপারহিরো ফ্যাটিগ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। ২০১৯ সালের পর ডিজনির প্রযোজিত মার্ভেল সিনেমাগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাপী ১০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করতে পেরেছে মাত্র একটি-২০২৪ সালের 'ডেডপুল অ্যান্ড উলভারিন' (১৩৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার)। যদিও ২০২২ সালে ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ইন দ্য মাল্টিভার্স অব ম্যাডনেস’ (৯৫ কোটি ৫৭ লাখ ডলার) এবং 'ব্ল্যাক প্যান্থার: ওয়াকান্ডা ফরএভার' (৮৫ কোটি ৯২ লাখ ডলার) ভালো ব্যবসা করেছে, সামগ্রিকভাবে মার্ভেলের আগের সাফল্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন মার্ভেলের ভরসা ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’র পরিচিত তারকারা।

এক বিলিয়ন ডলারের সাফল্য কি বারবার পাওয়া সম্ভব?

বড় বাজেটের সিনেমা বা তারকা থাকলেই যে সাফল্য আসবে, তার নিশ্চয়তা নেই। যেমন, ২০২৬ সালে টম ক্রুজ অভিনীত অ্যাপোক্যালিপটিক ব্যঙ্গধর্মী ছবি ‘ডিগার’ বক্স অফিসে চরম ব্যর্থ হয়েছে।

এর বিপরীতে কম বাজেটের সিনেমাও বিপুল মুনাফা করতে পারে। কারি বার্কার পরিচালিত হরর ছবি ‘অবসেশন’-এর নির্মাণ ব্যয় ছিল মাত্র ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার, কিন্তু বিশ্বব্যাপী এটি আয় করেছে প্রায় ৫২ কোটি ডলার। একইভাবে মাত্র ১ কোটি ডলারে নির্মিত কেন পারসনসের হরর ছবি ‘ব্যাকরুমস’ বিশ্বব্যাপী ৪০ কোটি ডলার আয় করেছে। এই দুই নির্মাতারই ইউটিউবে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে আগে থেকে দর্শক তৈরি হয়েছিল।

সর্বকালের সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমাগুলোর তালিকা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার-বক্স অফিসে সাফল্যের কোনো নির্দিষ্ট সূত্র নেই। বরং দর্শকের সঙ্গে গল্পের সংযোগ তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি সিনেমা দর্শককে আনন্দ দিতে পারলে, আবেগে নাড়া দিতে পারলে কিংবা নতুন অভিজ্ঞতা দিতে পারলে বক্স অফিসে সাফল্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়।