সুপারমার্কেটের ফ্রিজে সাইবার হামলার আশঙ্কা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ইন্টারনেট-সংযুক্ত প্রযুক্তিপণ্যের নিরাপত্তা নিয়ে। ঘরের স্মার্ট ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন কিংবা হিটিং সিস্টেম থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতিও এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে এসব ডিভাইসের নিরাপত্তায় সামান্য দুর্বলতাও বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে।
সম্প্রতি ইউরোপের কয়েকটি দেশে সুপারমার্কেটের হিমায়ন ব্যবস্থায় তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় সাইবার হামলার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কোনো প্রতিষ্ঠানের অনলাইন-সংযুক্ত যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ হ্যাকারদের হাতে গেলে তারা সেটির কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে পারে। এতে খাবার সংরক্ষণের ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে ইন্টারনেটে যুক্ত থাকলেই কোনো যন্ত্র সহজে হ্যাকারদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, বিষয়টি এমন নয়।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের সাবেক প্রধান নির্বাহী সিয়ারান মার্টিন মনে করেন, স্মার্ট ডিভাইসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীদেরও সচেতন থাকতে হবে। নিয়মিত সফটওয়্যার হালনাগাদ করা এবং মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু রাখার মতো পদক্ষেপ সাইবার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
এই ঝুঁকির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন ইউকে সাইবার ডিফেন্সের গবেষকেরা। তাঁদের অনুসন্ধানে যুক্তরাজ্যের খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৮০০টির বেশি ফ্রিজ ও ভবন নিয়ন্ত্রণের ইন্টারফেস শনাক্ত হয়েছে, যেগুলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে উন্মুক্ত ছিল। এসব ব্যবস্থায় দুর্বল পাসওয়ার্ড কিংবা সফটওয়্যারের ত্রুটি থাকলে সেগুলো সাইবার আক্রমণের লক্ষ্য হতে পারে। ব্রিটিশ রিটেল কনসোর্টিয়ামের প্রধান নির্বাহী হেলেন ডিকিনসনের ভাষায়, খুচরা ব্যবসার ক্ষেত্রে সাইবার হামলা এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সেন্টিনেলওয়ানের গবেষক টম হেগেল সতর্ক করে বলেছেন, যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা দুর্বল থাকলে আক্রমণকারীরা সেগুলোর কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতে পারে। যেমন, ফ্রিজের ডিফ্রস্টিং ব্যবস্থা চালু করে দেওয়া বা তাপমাত্রার সেটিংস পরিবর্তন করা সম্ভব হলে সংরক্ষিত পণ্য নষ্ট হতে পারে। এর প্রভাব শুধু একটি যন্ত্রে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; সংশ্লিষ্ট কম্পিউটার ব্যবস্থার কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে র্যানসমওয়্যার হামলার কারণে যুক্তরাজ্যের খুচরা বিক্রেতারা তাজা পণ্য সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছিলেন।
তবে সাইবার ঝুঁকি শুধু সুপারমার্কেটের ফ্রিজে সীমাবদ্ধ নয়। শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, গাড়ি, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অনেক সরঞ্জাম দূর থেকে পর্যবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য ইন্টারনেট বা মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ কেন মুনরো জানান, ২০১৫ সালে গবেষকেরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে জিপ গাড়ির নিয়ন্ত্রণে প্রবেশের সক্ষমতা দেখিয়েছিলেন। ওই ঘটনার পর গাড়ি নির্মাতারা নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারে মনোযোগ দেয়।
কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একই মাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই এখনো পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান জেডস্কেলারের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অলিভিয়ার ডালয়ের মতে, যথাযথ সুরক্ষা না থাকলে ইন্টারনেট-সংযুক্ত কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা পরিবহন অবকাঠামোও একই ধরনের হামলার শিকার হতে পারে। তাই স্মার্ট ডিভাইসের নিরাপত্তা এখন শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয় নয়, বরং জরুরি সেবা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখারও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন