একসময় হ্যাকিং বলতে কম্পিউটার বা স্মার্টফোন থেকে ব্যক্তিগত তথ্য চুরির বিষয়টিই বেশি মনে করা হতো। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে বদলে গেছে সাইবার অপরাধের ধরনও। এখন স্মার্ট টিভি, সিসিটিভি ক্যামেরা, স্মার্ট লক, ভিডিও ডোরবেল, এমনকি ইন্টারনেট-সংযুক্ত ফ্রিজও সাইবার হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
স্মার্টহোম প্রযুক্তির কারণে ঘরের অনেক যন্ত্র এখন স্মার্টফোনের মাধ্যমে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফ্রিজের তাপমাত্রা পরিবর্তন, ক্যামেরায় বাড়ির পরিস্থিতি দেখা কিংবা স্মার্ট লকের সাহায্যে দরজা খোলার মতো সুবিধা জীবনকে সহজ করেছে। তবে এসব ডিভাইসের নিরাপত্তায় দুর্বলতা থাকলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও বাড়ির নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
স্মার্ট ফ্রিজও কি হ্যাক করা সম্ভব?
সংক্ষিপ্ত উত্তর, হ্যাঁ। ইন্টারনেট বা ওয়াই-ফাইয়ের সঙ্গে যুক্ত স্মার্ট ফ্রিজে নিরাপত্তার দুর্বলতা থাকলে সেটি সাইবার হামলার লক্ষ্য হতে পারে। বিশেষ করে পুরোনো সফটওয়্যার, দুর্বল পাসওয়ার্ড কিংবা নির্মাতার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
তবে স্মার্ট ফ্রিজ হ্যাক হওয়ার অর্থ এই নয় যে কেউ সরাসরি ফ্রিজের ভেতরের খাবার দেখতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ডিভাইসের ধরন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে হ্যাকার সংরক্ষিত তথ্য সংগ্রহ, ডিভাইসের কিছু কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ কিংবা সেটিকে অন্য সাইবার হামলার কাজে ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে স্মার্ট ডিভাইসের নিরাপত্তা দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের তথ্য সংগ্রহের ঘটনাও উঠে এসেছে। তাই স্মার্ট ফ্রিজ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
স্মার্টহোমের কোন কোন ডিভাইসে ঝুঁকি বেশি?
স্মার্ট ফ্রিজ একমাত্র ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্র নয়। ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত প্রায় সব ডিভাইসেই নিরাপত্তার দুর্বলতা থাকলে সাইবার হামলার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
১. সিসিটিভি ক্যামেরা
বাড়ির নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত সিসিটিভি ক্যামেরা হ্যাক হলে ব্যক্তিগত পরিসরের ভিডিও ও দৃশ্য অন্যের হাতে চলে যেতে পারে। এতে পরিবারের সদস্যদের দৈনন্দিন চলাফেরা ও ব্যক্তিগত মুহূর্তের গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
২. স্মার্ট লক ও ভিডিও ডোরবেল
স্মার্ট লক ও ভিডিও ডোরবেল দূর থেকে বাড়ির প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণের সুবিধা দেয়। কিন্তু এগুলোর নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে চলে গেলে বাড়ির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। ভিডিও ডোরবেলের মাধ্যমে ধারণ করা দৃশ্যও অননুমোদিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছানোর ঝুঁকি থাকে।
৩. স্মার্ট টিভি
ইন্টারনেট সংযুক্ত স্মার্ট টিভিতে বিভিন্ন অ্যাপ ও অনলাইন সেবা ব্যবহার করা যায়। দুর্বল নিরাপত্তা বা অনিরাপদ অ্যাপের কারণে ব্যক্তিগত তথ্য ও অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
৪. স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট ও অন্যান্য যন্ত্র
স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট, অ্যালার্ম সিস্টেম এবং ইন্টারনেট-সংযুক্ত অন্যান্য গৃহস্থালি যন্ত্রও সাইবার অপরাধীদের লক্ষ্য হতে পারে। কোনো ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ পেলে সেটির সেটিংস পরিবর্তন করে ব্যবহারকারীকে ভোগান্তিতে ফেলা সম্ভব।
একটি ডিভাইস হ্যাক হলে পুরো বাড়িই কি ঝুঁকিতে?
স্মার্টহোমের বড় একটি নিরাপত্তা সমস্যা হলো, অনেক ডিভাইস একই ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকে। ফলে একটি ডিভাইসের নিরাপত্তা ভেঙে গেলে হ্যাকার নেটওয়ার্কের অন্য ডিভাইসগুলোতেও প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে রাউটারের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাউটারের পাসওয়ার্ড দুর্বল হলে কিংবা সফটওয়্যার পুরোনো থাকলে পুরো হোম নেটওয়ার্ক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কোনো ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ পেলে সাইবার অপরাধীরা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, ক্যামেরার ভিডিওতে অননুমোদিত প্রবেশ কিংবা ডিভাইসটিকে অন্য নেটওয়ার্কে হামলার কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে।
স্মার্টহোম হ্যাক হলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে?
স্মার্টহোমে সাইবার হামলার ক্ষতি শুধু যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলে কয়েক ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
ব্যক্তিগত তথ্য চুরি: ডিভাইস বা অ্যাকাউন্টে সংরক্ষিত তথ্য অন্যের হাতে যেতে পারে।
গোপনীয়তা নষ্ট: ক্যামেরা ও ভিডিও ডোরবেলের মাধ্যমে ব্যক্তিগত দৃশ্য অননুমোদিতভাবে দেখা বা সংগ্রহ করা হতে পারে।
বাড়ির নিরাপত্তা বিঘ্নিত: স্মার্ট লক বা অ্যালার্ম সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
অনলাইন অ্যাকাউন্টের ঝুঁকি: ডিভাইসের সঙ্গে যুক্ত অ্যাকাউন্ট বা অন্যান্য সেবার নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্য সাইবার হামলায় ব্যবহার: দুর্বল নিরাপত্তার ডিভাইসকে অন্য ওয়েবসাইট বা নেটওয়ার্কে হামলার কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।
স্মার্টহোম নিরাপদ রাখবেন যেভাবে
স্মার্ট ডিভাইসের সুবিধা নিতে হলে শুরু থেকেই নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। কয়েকটি অভ্যাস অনুসরণ করলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
১. ডিফল্ট পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন: নতুন ডিভাইস ব্যবহারের আগে নির্মাতার দেওয়া ডিফল্ট পাসওয়ার্ড বদলে শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।
২. টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু রাখুন: যেখানে সুবিধা রয়েছে, সেখানে দুই ধাপে পরিচয় যাচাই বা টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন সক্রিয় করুন।
৩. নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট করুন: ডিভাইসের সফটওয়্যার ও ফার্মওয়্যার হালনাগাদ রাখুন। এতে পরিচিত নিরাপত্তা দুর্বলতা দূর করার সুযোগ থাকে।
৪. রাউটারের নিরাপত্তা বাড়ান: রাউটারের ডিফল্ট পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন এবং নিরাপত্তা সেটিংস নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
৫. অপ্রয়োজনীয় ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করুন: যে ডিভাইসের দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ বা ইন্টারনেট সংযোগ প্রয়োজন নেই, সেটির অপ্রয়োজনীয় সংযোগ বন্ধ রাখুন।
৬. ডিভাইসের প্রবেশাধিকার সীমিত করুন: সিসিটিভি ক্যামেরা, ভিডিও ডোরবেল ও স্মার্ট লকের অ্যাকাউন্টে কারা প্রবেশ করতে পারবেন, তা নির্দিষ্ট করে দিন।
৭. আলাদা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করুন: সম্ভব হলে স্মার্ট ডিভাইসগুলোকে ব্যক্তিগত কম্পিউটার ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকা নেটওয়ার্ক থেকে আলাদা রাখুন।
৮. পুরোনো ডিভাইসের নিরাপত্তা পরীক্ষা করুন: কোনো ডিভাইসের নির্মাতা নিরাপত্তা আপডেট দেওয়া বন্ধ করলে সেটি ব্যবহারের ঝুঁকি বিবেচনা করুন। প্রয়োজন হলে নতুন নিরাপদ ডিভাইস ব্যবহার করুন।
প্রযুক্তির সুবিধার সঙ্গে নিরাপত্তাও জরুরি
স্মার্টহোম প্রযুক্তি দৈনন্দিন জীবনকে সহজ ও স্বয়ংক্রিয় করে তুলছে। কিন্তু ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি যন্ত্রের নিরাপত্তার দায়িত্বও ব্যবহারকারীর ওপর এসে পড়ছে।
একটি দুর্বল পাসওয়ার্ড, পুরোনো সফটওয়্যার কিংবা অনিরাপদ রাউটার পুরো বাড়ির ডিজিটাল নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তাই স্মার্ট ডিভাইস কেনার সময় শুধু সুবিধা নয়, নির্মাতার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিয়মিত আপডেট দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা জরুরি।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন