পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান আন্দোলন ঘিরে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধন, কিছু শিল্পমালিকের সম্পৃক্ততা এবং তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশের অভিযোগ উঠেছে। সরকারের দাবি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি ও দলটির ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যবসায়ী আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে পোশাক শ্রমিকদের স্বল্প বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম, বাড়িভাড়া ও পরিবারের অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সংকটে পড়ছেন তারা। অনেক শ্রমিককে খাবারসহ মৌলিক চাহিদার ক্ষেত্রেও আপস করতে হচ্ছে। ফলে মজুরি বাড়ানোর দাবি শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বাস্তব সমস্যা থেকেই তৈরি হয়েছে।

শ্রমিকদের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত হারে বেতন বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন শ্রমিকদের একটি অংশ। এরই মধ্যে আন্দোলনের মধ্যে রাজনৈতিক পক্ষের অনুপ্রবেশ ও উসকানির অভিযোগ সামনে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, শ্রমিক আন্দোলন ও শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতার পেছনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ইন্ধন রয়েছে বলে সরকারের কাছে তথ্য ও প্রমাণ আছে। কিছু শিল্পমালিকও এতে জড়িত বলে দাবি করেন তিনি। গত সোমবার সচিবালয়ে পোশাক শিল্প মালিকদের দুটি সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান মন্ত্রী।

তিনি আরও বলেন, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠনের আলোচনা চলার মধ্যেই পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজন শিল্পমালিক, শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কারখানা বন্ধ রাখা মালিকদের তালিকাও চেয়েছে সরকার।

সরকারের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের সাবেক কয়েকজন নেতা ও দলটির ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে বলে জানা গেছে। তালিকায় বেক্সিমকো গ্রুপ, সেপাল গ্রুপ, এনভয় গ্রুপ, রেনেসাঁ গ্রুপ, হামিদ গ্রুপ ও ফেবিয়ান গ্রুপের নাম রয়েছে। এ ছাড়া তুষুকা, ওয়েল, নিপা, স্ট্যান্ডার্ড ও গিভেন্সি গ্রুপের কয়েকজন মালিকের নামও প্রতিবেদনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের আন্দোলনে অংশ নিতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী শ্রমিক আন্দোলনকে ব্যবহার করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করেছেন বলেও একটি সূত্র জানিয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটকের খবর পাওয়া গেছে।

তবে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুরুতে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন হলেও পরে এতে তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। কোথাও কোথাও শ্রমিকদের জোর করে রাস্তায় নামানোর অভিযোগও রয়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তৌহিদুর রহমান বলেন, প্রকৃত শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন একটি পক্ষ ছিনতাই করেছে। শ্রমিকদের উসকানিতে পা না দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে কাজে ফেরার আহ্বান জানান তিনি।

বিজিএমইএর পরিচালক ও মজুরি বোর্ডের মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবিএম সামছুদ্দিন জানিয়েছেন, কোনো কারখানার মালিকের আন্দোলনে ইন্ধন দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বিজিএমইএর সব ধরনের সেবা দেওয়া বন্ধ করা হবে। অন্যদিকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কারও নাম এসেছে বলে শোনা গেলেও সংগঠনটি এখনো কোনো তালিকা পায়নি। সহিংসতা ও ভাঙচুরের কারণে শিল্পাঞ্চলের ৬৭৯টি কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।

নতুন মজুরি বোর্ডের বৈঠক শুরু হলে চলতি নভেম্বরের মধ্যেই মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করার আশা প্রকাশ করেছেন মালিকপক্ষের প্রতিনিধি। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতারও জানিয়েছেন, আগামী জানুয়ারি থেকে শ্রমিকরা যাতে বাড়তি মজুরি পান, সেভাবে কাজ করা হবে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে আটক শ্রমিক ও নেতাদের মুক্তি এবং হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখতে হবে। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং শিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখা এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবি যেন রাজনৈতিক স্বার্থ কিংবা সহিংসতার কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।