বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া, দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হওয়ার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। সরকার পরিবর্তন হলেও সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁদের পেশাগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বিষয়টি এ বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ২৫ নম্বর বিধিতে রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে এসব বিধিনিষেধ নির্ধারণ করা হয়েছে। সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে ১৯৭৯ সালের ১৮ মে বিধিমালাটি জারি করা হয়। এর উদ্দেশ্য সরকারি প্রশাসনের আচরণ ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা।
রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া ও কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ২৫(১) উপবিধি অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন না। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো সংগঠনের সদস্য হওয়া বা অন্য কোনোভাবে যুক্ত থাকাও নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে বাংলাদেশে কিংবা বিদেশে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বা কোনোভাবে সহায়তা করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞাটি শুধু রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক সদস্যপদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতার বিষয়টিও এর আওতাভুক্ত।
নির্বাচনী প্রচারণা ও প্রভাব বিস্তারেও বিধিনিষেধ
বিধিমালার ২৫(৩) উপবিধিতে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী আইনসভার নির্বাচনে প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে, নির্বাচনী কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতে, নিজের প্রভাব প্রয়োগ করতে কিংবা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
তবে এ বিধানে সরকারি কর্মচারীদের ভোটাধিকার অস্বীকার করা হয়নি। ভোট দেওয়ার যোগ্য সরকারি কর্মচারী নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। কিন্তু তিনি কাকে ভোট দিতে চান বা দিয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো প্রকাশ্য ইঙ্গিত দিতে পারবেন না।
একই বিধির ২৫(৫) ও ২৫(৬) উপবিধিতে নির্বাচনে নিজেকে প্রার্থী বা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রকাশ করার বিষয় এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার নির্বাচনে বিধিনিষেধ প্রয়োগের বিষয়েও বিধান রয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আইন বা সরকারি আদেশে অনুমোদিত ব্যতিক্রমের বিষয়টি বিবেচ্য।
সরকার পরিবর্তন হলেও দায়িত্বের ধরন বদলায় না
বাংলাদেশে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন একটি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের পেশাগত দায়িত্বের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তিত হয় না।
সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব হলো সংবিধান, প্রচলিত আইন এবং বৈধ সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা। তাঁরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন না।
সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের (২) উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির দায়িত্ব সর্বদা জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা।
এ কারণে ক্ষমতাসীন সরকারের পরিবর্তন হলেও সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে তার বৈধ নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য প্রদর্শন কিংবা সরকারি পদমর্যাদা ব্যবহার করে দলীয় স্বার্থ বাস্তবায়ন এ পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিধিমালা লঙ্ঘন করলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে?
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ৩২ নম্বর বিধিতে আচরণবিধির কোনো বিধান লঙ্ঘনকে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। মূল বিধিতে এ ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫-এর উল্লেখ রয়েছে।
তবে ২০১৮ সালের ১৮ এপ্রিল জারি করা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার ২৮ নম্বর বিধিতে ১৯৮৫ সালের বিধিমালা রহিত করা হয়েছে। ফলে বর্তমান শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের বিধিমালা এবং প্রযোজ্য অন্যান্য আইনগত বিধান বিবেচনায় নিতে হয়।
অভিযোগের ধরন, প্রমাণ এবং প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী বিভাগীয় কার্যক্রম ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে অভিযোগ উঠলেই কোনো সরকারি কর্মচারীকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ১৩৫ অনুচ্ছেদও গুরুত্বপূর্ণ। এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে বরখাস্ত, অপসারণ বা পদাবনতি করার আগে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তিসংগত সুযোগ দিতে হবে। সংবিধানে নির্ধারিত কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সরকার পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন ও জনসেবামূলক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দায়িত্ব সরকারি কর্মচারীদের ওপর বর্তায়। তাঁদের দায়িত্ব পালনে রাজনৈতিক প্রভাব বা দলীয় পক্ষপাত তৈরি হলে সাধারণ মানুষের সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য ও প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের বিধিনিষেধ এবং জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনের সাংবিধানিক নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ।
আইনের মূল বক্তব্য হলো, সরকারি চাকরি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব নয়। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের আইন মেনে দায়িত্ব পালন, জনগণের সেবা এবং পেশাগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা বহাল থাকে।
সূত্র: বাংলাদেশের সংবিধানের ২১, ১৩৩ ও ১৩৫ অনুচ্ছেদ; সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ২৫ ও ৩২ নম্বর বিধি; সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন