একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নতি নির্ভর করে কর্মীদের দক্ষতা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং কাজের প্রতি আন্তরিকতার ওপর। কিন্তু অনেক কর্মক্ষেত্রে দেখা যায়, কেউ কেউ নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালনের চেয়ে সহকর্মীদের নিয়ে আলোচনা, পেছনে সমালোচনা কিংবা দলাদলিতে বেশি সময় ব্যয় করেন। কর্মক্ষেত্রে এ ধরনের আচরণই পরিচিত অফিস পলিটিক্স হিসেবে।

অফিস পলিটিক্স সব সময় প্রকাশ্যে হয় না। কখনো মিষ্টি হাসির আড়ালে চলে সহকর্মীর বদনাম, কখনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে নিজেকে ভালো প্রমাণ করতে অন্যের কাজকে ছোট করে দেখানো হয়। আবার কেউ কেউ নিজের দক্ষতা বাড়ানোর পরিবর্তে সহকর্মীর অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এভাবে অন্যকে পিছিয়ে দিয়ে কি সত্যিই নিজের ক্যারিয়ারে উন্নতি করা সম্ভব?

অফিস পলিটিক্সের সাধারণ কিছু লক্ষণ

কর্মক্ষেত্রে কিছু আচরণ থেকে বোঝা যায়, কোনো ব্যক্তি কাজের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও দলাদলিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

১. সামনে ভালো ব্যবহার, পেছনে সমালোচনা

সামনাসামনি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করলেও আড়ালে সহকর্মীর নামে নেতিবাচক কথা বলা অফিস পলিটিক্সের পরিচিত একটি ধরন। এতে সহকর্মীদের মধ্যে বিশ্বাস নষ্ট হয় এবং কর্মপরিবেশ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।

২. নিজের কাজের চেয়ে অন্যের ভুল খোঁজায় আগ্রহ

কেউ নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন না করেও অন্যের ছোটখাটো ভুল নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করতে পারেন। গঠনমূলকভাবে ভুল ধরিয়ে দেওয়া আর কাউকে ছোট করার উদ্দেশ্যে ভুল খোঁজা এক বিষয় নয়।

৩. ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে পক্ষপাতমূলক আচরণ

কিছু কর্মী কাজের মানের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা অতিরিক্ত তোষামোদকে গুরুত্ব দিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করেন। এতে প্রকৃত দক্ষ কর্মীরা যথাযথ মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।

৪. সহকর্মীদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা

একজনের কথা অন্যজনের কাছে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা, ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করা কিংবা কর্মীদের মধ্যে দল গঠন করা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট করতে পারে।

৫. অন্যের সাফল্য সহজে মেনে নিতে না পারা

সহকর্মী ভালো কাজ করলে তাকে অভিনন্দন জানানোর পরিবর্তে তার সাফল্যকে খাটো করা বা পেছনে নেতিবাচক মন্তব্য করা সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ নয়।

অফিস পলিটিক্স প্রতিষ্ঠানের জন্য কেন ক্ষতিকর?

অফিস পলিটিক্সের প্রভাব শুধু দুই সহকর্মীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ধীরে ধীরে এটি পুরো প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিবেশ ও উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

  • কর্মীদের মধ্যে বিশ্বাস কমে যায়: সহকর্মীরা একে অপরকে সহযোগিতা করতে দ্বিধা করেন।

  • কাজের গতি বাধাগ্রস্ত হয়: দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে সময় ব্যয় হয় ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও ভুল বোঝাবুঝি সামলাতে।

  • যোগ্য কর্মীরা হতাশ হন: কাজের স্বীকৃতির বদলে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেশি গুরুত্ব পেলে দক্ষ কর্মীদের আগ্রহ কমে যেতে পারে।

  • দলগত কাজ দুর্বল হয়: পারস্পরিক সহযোগিতার জায়গায় প্রতিযোগিতা ও সন্দেহ তৈরি হয়।

  • প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে: কর্মীদের অসন্তোষ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অফিস পলিটিক্সের শিকার হলে কী করবেন?

কর্মক্ষেত্রে সব পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। তবে কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব এড়িয়ে পেশাদার অবস্থান ধরে রাখা যায়।

১. নিজের দায়িত্ব ও কাজের মানের দিকে মনোযোগ দিন।

২. গুরুত্বপূর্ণ কাজ, সিদ্ধান্ত ও দায়িত্বসংক্রান্ত যোগাযোগের লিখিত রেকর্ড রাখুন।

৩. কারও সম্পর্কে যাচাই না করা তথ্য ছড়ানো বা ব্যক্তিগত আলোচনায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

৪. সহকর্মীর সঙ্গে মতবিরোধ হলে ব্যক্তিগত আক্রমণ না করে বিষয়টি পেশাদারভাবে সমাধানের চেষ্টা করুন।

৫. কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে হয়রানি বা কাজের ক্ষতি করলে প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ বা মানবসম্পদ বিভাগকে জানান।

৬. নিজের দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত শেখার ও কাজের উন্নতির চেষ্টা করুন।

যোগ্যতা ও কাজের মূল্যই হওয়া উচিত ক্যারিয়ারের ভিত্তি

কর্মক্ষেত্রে সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক। প্রত্যেকেই নিজের উন্নতি চাইবেন, ভালো পদে যেতে চাইবেন এবং কাজের স্বীকৃতি আশা করবেন। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যেন অন্যকে ছোট করা বা ক্ষতি করার মাধ্যমে না হয়।

একজন দক্ষ কর্মীর সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তাঁর কাজের মান, সততা, দায়িত্ববোধ এবং পেশাদার আচরণ। সাময়িকভাবে অফিস পলিটিক্সের মাধ্যমে কাউকে বিব্রত করা বা তার অগ্রগতিতে বাধা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজন এমন কর্মী, যিনি নিজের যোগ্যতা দিয়ে কাজের মাধ্যমে অবদান রাখেন।

মনে রাখতে হবে, অফিস কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা নয়। এটি সম্মিলিতভাবে কাজ করার একটি পরিবেশ। এখানে অন্যকে নিচে নামিয়ে নয়, নিজের দক্ষতা ও কর্মগুণ দিয়ে এগিয়ে যাওয়াই প্রকৃত সাফল্য।