সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক করা, রাজনৈতিক পরিচয়ে হয়রানি বন্ধ এবং বিসিএস পরীক্ষা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার দাবিতে ১৩ দফা প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ওয়ান ইয়ার, ওয়ান বিসিএস’ নীতি বাস্তবায়ন, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে চূড়ান্ত পদায়ন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১২ মাস নির্ধারণ এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করা।

বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভের পাদদেশে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরে ছাত্রশিবির। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম লিখিত বক্তব্যে সরকারের প্রতি ১৩ দফা দাবি উপস্থাপন করেন।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমান, প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া তথ্য ও মানবাধিকার সম্পাদক তানজির হোছাইন জুয়েল, আন্তর্জাতিক সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, পাঠাগার সম্পাদক হাবিবুল্লাহ খন্দকার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি ও ডাকসুর এজিএস মহিউদ্দিন খান উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা ও পেশাদারিত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কাঠামোগত সংস্কার থেকে শুরু করে নিয়োগ ও পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে সংগঠনটির উত্থাপিত ১৩ দফা দাবি হলো:

১. পিএসসির কাঠামোগত সংস্কার: জুলাই সনদে উল্লিখিত প্রস্তাবনা অনুযায়ী পিএসসির কাঠামোগত সংস্কার এবং চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠন করতে হবে।

২. সব নিয়োগ পিএসসির অধীনে: নবম ও দশম গ্রেডসহ সব সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া পিএসসির অধীনে সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক ও আর্থিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

৩. ‘ওয়ান ইয়ার, ওয়ান বিসিএস’ নীতি: লিখিত পরীক্ষায় কোডভিত্তিক মূল্যায়ন, ১০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা এবং প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি ‘ওয়ান ইয়ার, ওয়ান বিসিএস’ নীতিসহ মোনেম কমিশনের নেওয়া সংস্কার উদ্যোগগুলো বহাল রাখতে হবে।

৪. বার্ষিক নিয়োগ ক্যালেন্ডার: সব মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত শূন্য পদের চাহিদা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংগ্রহ করে সমন্বিত বার্ষিক নিয়োগ ক্যালেন্ডার প্রকাশ করতে হবে।

৫. ১২ মাসে নিয়োগ সম্পন্ন: নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত পদায়ন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১২ মাসের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। কোনো কারণে বিলম্ব হলে তার ব্যাখ্যা অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে।

৬. রাজনৈতিক পরিচয়ে বৈষম্য বন্ধ: প্রার্থী কিংবা তাঁর পরিবারের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য রোধে কার্যকর ও নিরপেক্ষ অভিযোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৭. ভেরিফিকেশনের নিয়ম প্রকাশ: পুলিশ ভেরিফিকেশনের উদ্দেশ্য, মানদণ্ড এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের নিয়মাবলি লিখিতভাবে প্রকাশ করতে হবে।

৮. ১৫ কার্যদিবসে পুলিশ ভেরিফিকেশন: জাতীয় পরিচয়পত্র ও সরকারি অপরাধের রেকর্ডের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করতে হবে।

৯. আপিলের সুযোগ নিশ্চিত: ভেরিফিকেশনে নেতিবাচক তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। পাশাপাশি পুনর্বিবেচনা ও আপিলের আইনগত সুযোগ দিতে হবে।

১০. মৌখিক পরীক্ষায় অডিও রেকর্ড: ভাইভায় অস্বাভাবিক নম্বর প্রদানের অসঙ্গতি রোধে অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

১১. লিখিত পরীক্ষার মেধার মূল্যায়ন: ভাইভার নম্বর অপ্রয়োজনে বাড়িয়ে লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধার অবমূল্যায়ন করার অপচেষ্টা বন্ধ করতে হবে।

১২. প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি: প্রশ্নফাঁস, প্রক্সি পরীক্ষা ও ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ে জালিয়াতি রোধে আধুনিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে পিএসসির নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।

১৩. সরকারি কর্মচারী আইন সংশোধন: সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৮-এর ৮, ১৯ ও ২০ ধারাসহ অন্যান্য বিধান সংশোধন করে আনুগত্যের পরিবর্তে মেধা, সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বকে প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

ছাত্রশিবিরের মতে, এসব দাবি বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমবে এবং মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থীদের মূল্যায়নের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে নিয়োগব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় এসব সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।