নভেম্বর মাস এসে গেছে, কিন্তু ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার লক্ষণ নেই। একসময় ডেঙ্গুকে বর্ষার রোগ বলা হতো। জুলাই-আগস্টে বাড়ত, শীত পড়লে কমে যেত। সেই হিসাব এখন আর মেলে না। কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, বর্ষা শেষ হওয়ার পরও হাসপাতালের ওয়ার্ডে রোগীর ভিড় থাকে, আর শোকাহত পরিবারের সংখ্যাও বাড়ে। প্রশ্ন হলো, প্রতি বছর একই ঘটনা ঘটলে আমরা আর কতদিন একে "প্রাকৃতিক দুর্যোগ" বলে দায় এড়াব?

ডেঙ্গু প্রতিরোধযোগ্য রোগ। এর বাহক এডিস মশা কোথায় জন্মায়, কখন কামড়ায়, কীভাবে ছড়ায়, সবই জানা। জমে থাকা পরিষ্কার পানি, নির্মাণাধীন ভবনের বেজমেন্ট, ছাদের টব, ফেলে রাখা টায়ার আর ডাবের খোসা হলো এর প্রজননক্ষেত্র। এত কিছু জানার পরও প্রতি বছর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর অর্থ, সমস্যাটা জ্ঞানের অভাবে নয়। সমস্যা প্রয়োগে।

প্রথমত, মশক নিধন কার্যক্রম এখনও মূলত প্রতিক্রিয়ামূলক। প্রকোপ বাড়লে ফগার মেশিনের ধোঁয়া দেখা যায়, গণমাধ্যমে ছবি ছাপা হয়, তারপর আবার নীরবতা। অথচ বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরে বলে আসছেন, উড়ন্ত মশা মারার চেয়ে লার্ভা ধ্বংস করা অনেক বেশি কার্যকর। এর জন্য সারা বছর নিয়মিত জরিপ, তথ্যভিত্তিক মানচিত্র আর এলাকাভিত্তিক তদারকি দরকার। এক মৌসুমের অভিযান দিয়ে এ কাজ হয় না।

দ্বিতীয়ত, কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। মশা যদি প্রচলিত ওষুধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে, তবে সেই ওষুধ ছিটিয়ে শুধু অর্থের অপচয় হয়। নিরপেক্ষ গবেষণাগারে নিয়মিত পরীক্ষা এবং সেই ফল প্রকাশ করা জরুরি।

তৃতীয়ত, চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ। ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীর সমস্যা নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু অনেক জায়গায় প্লাটিলেট পরীক্ষা, প্রশিক্ষিত জনবল ও পর্যাপ্ত শয্যার অভাব রয়েছে। ফলে গুরুতর রোগীকে শেষ মুহূর্তে বড় শহরে পাঠাতে হয়, আর পথেই অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার একটি ন্যূনতম মান নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

চতুর্থত, নাগরিকের দায়ও কম নয়। নিজের বাড়ির ছাদ, বারান্দা আর আঙিনায় তিন দিনের বেশি পানি জমতে না দেওয়া কোনো কঠিন কাজ নয়। নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও বাড়ির মালিকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে শুধু জরিমানার ভয় দেখিয়ে লাভ হবে না। ধারাবাহিক সচেতনতা কার্যক্রম, স্কুল ও মসজিদ-মন্দিরভিত্তিক প্রচার এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করাই টেকসই পথ।

সবচেয়ে বড় কথা, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা দরকার। সেখানে সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে, আর থাকবে জবাবদিহির কাঠামো। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দায় ঠেলাঠেলির সংস্কৃতি বন্ধ না হলে আগামী বছরও আমাদের একই সম্পাদকীয় লিখতে হবে।

প্রতিটি ডেঙ্গু মৃত্যু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি, আর একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার একটি সূচক। আমরা চাই, এই মৌসুম শেষ হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে কর্তৃপক্ষ এখনই আগামী বছরের প্রস্তুতি শুরু করুক। প্রতিরোধযোগ্য রোগে মানুষের মৃত্যু কোনো সভ্য সমাজে স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না।