দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজস্ব সার্বভৌম বাংলা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) তৈরি এবং ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান আইডি’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর আওতায় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন ও করসংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন সরকারি তথ্যভাণ্ডার একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অধীনে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, সরকারি তথ্যের অপব্যবহার রোধ এবং প্রযুক্তি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আইসিটি টাওয়ারে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সচিব ড. মো. মামুনুর রশিদ ভুঁঞা এসব তথ্য জানান। তথ্যপ্রযুক্তি সাংবাদিক ও একাডেমিক পেশাজীবীদের সংগঠন সেন্টার ফর টেকনোলজি জার্নালিজমের (সিটিজে) নির্বাহী কমিটির সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি সরকারের এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। সভায় আইসিটি বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মজিবর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
আইসিটি সচিব জানান, বর্তমানে নাগরিকদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য একাধিক সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের আলাদা আলাদা তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত রয়েছে। এসব তথ্য সমন্বিত করে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর ফলে নাগরিকদের তথ্য ব্যবস্থাপনা সহজ হওয়ার পাশাপাশি তথ্যের অপব্যবহার, জালিয়াতি এবং অননুমোদিত ব্যবহার প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি বিশ্বস্ত ইন্টারঅপারেবিলিটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির কাজ চলছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যভাণ্ডারের মধ্যে নিরাপদ সংযোগ ও সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। পাশাপাশি নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দেশের সাইবার স্পেস নিরাপদ রাখতে সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সিকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান সচিব। এ লক্ষ্যে সংস্থাটিতে ১২০ জন জনবল নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের বড় একটি অংশ কারিগরি বিষয়ে দক্ষ বিশেষজ্ঞ হবেন। তাদের মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো এবং অনলাইন ব্যবস্থার নিরাপত্তা জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশের তথ্যের সার্বভৌমত্ব ধরে রাখতেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য নিজস্ব বাংলা এআই মডেল তৈরির পাশাপাশি শেয়ারড জিপিইউ অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান আইসিটি সচিব। এতে দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং নিজস্ব তথ্য ও প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে বিভাগটি।
এ ছাড়া স্টার্টআপ বাংলাদেশ ও আইসিটি বিভাগের যৌথ পরিচালনায় উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক ধারণা ও উদ্ভাবনী প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকৃত উদ্যোক্তারা যাতে সহায়তা পান, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের সব সেতু ও টোল প্লাজার জন্য ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল টোল সিস্টেম’ চালুর পরিকল্পনার কথাও সভায় জানান সচিব।
মতবিনিময় সভায় সিটিজের সভাপতি ও সমকালের সহকারী সম্পাদক হাসান জাকির আইসিটি বিভাগের কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দক্ষ জনবল তৈরির নামে নামকাওয়াস্তে প্রশিক্ষণ দিয়ে কোনো গোষ্ঠীকে অর্থ তছরুপের সুযোগ দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে অর্থের অপচয় হয় এমন প্রকল্প ও কর্মসূচি গ্রহণ থেকেও বিরত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
সিটিজের মহাসচিব ও যুগান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক সাইফ আহমাদ বলেন, প্রযুক্তি খাতে নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তথ্যের গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। উদ্ভাবনী প্রকল্পে দেওয়া আর্থিক সহায়তা যেন প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের সুযোগ বন্ধ রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সভায় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সংবাদ তৈরির প্রয়োজনে দ্রুত তথ্য সরবরাহ, এআই ও সাইবার নিরাপত্তাসহ প্রযুক্তির নতুন খাত নিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ আয়োজন এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সভা ও কমিটিতে সিটিজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
সিটিজের দাবিগুলোকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে আইসিটি সচিব ড. মামুনুর রশিদ ভুঁঞা বলেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর। আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন ছাড়া আইসিটি বিভাগ আর কোনো প্রশিক্ষণ দেবে না। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এবং নামকাওয়াস্তে প্রশিক্ষণের সুযোগ আর থাকবে না।
তিনি আরও জানান, স্টার্টআপসহ বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। এ বিষয়ে সিটিজের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার পাশাপাশি সংগঠনটিকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
সভায় সিটিজের সহসভাপতি মিজানুর রহমান সোহেল, পরিচালক (সাংগঠনিক) রেজাউল করিম জ্যান, বাংলাদেশ প্রতিদিনের বিশেষ প্রতিবেদক কাজী সোহাগ, প্রথম আলোর স্টাফ রিপোর্টার রাহিতুল ইসলামসহ সংগঠনটির অন্যান্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন