পবিত্র কোরআনের ১১৪টি সুরার মধ্যে ১১৩টি সুরাই ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ দিয়ে শুরু হয়েছে। এর একমাত্র ব্যতিক্রম হলো সুরা তওবা। আল্লাহর কালামের প্রতিটি শব্দ যেখানে সযত্নে সংরক্ষিত, সেখানে একটি সুরার শুরুতে বিসমিল্লাহ না থাকার কারণ কী? চলুন, বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

খলিফা ওসমানের (রা.) বর্ণনা

এ বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হলো খলিফা ওসমান ইবনে আফফানের (রা.) বক্তব্য। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, সুরা আনফাল ও সুরা তওবার বিষয়বস্তু কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও তিনি কেন দুটি সুরা পাশাপাশি রেখেছেন, অথচ মাঝখানে বিসমিল্লাহ লেখেননি?

উত্তরে ওসমান (রা.) কোরআন সংকলনের সময়কার পটভূমি তুলে ধরে জানান, আনফাল ছিল মদিনায় অবতীর্ণ হওয়া প্রথম দিকের সুরাগুলোর একটি, আর তওবা ছিল শেষ দিকে নাজিল হওয়া অংশের অন্যতম। দুই সুরার বিষয়বস্তুতেও মিল ছিল। কিন্তু রাসুল (সা.) ইন্তেকালের আগে তওবা আনফালেরই অংশ কি না, তা স্পষ্ট করে যাননি। তাই তিনি সুরা দুটিকে পাশাপাশি রাখলেন, মাঝখানে বিসমিল্লাহ লিখলেন না (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩০৮৬)।

দুই সুরার সাদৃশ্য

সুরা আনফালে বদরের যুদ্ধ, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য এবং মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা রয়েছে। অন্যদিকে, সুরা তওবার শুরুতে আছে মুশরিকদের সঙ্গে চুক্তির অবসান ও মুসলমানদের দায়িত্বের ঘোষণা। দুই সুরাতেই তৎকালীন মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা ফুটে উঠেছে।

তাফসির অনুযায়ী আরও ৩টি কারণ

খলিফা ওসমানের (রা.) বর্ণনার বাইরেও তাফসিরের কিতাবে আরও কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে:

  • ১. আরবদের রীতি: জাহেলি যুগে কোনো গোত্রের সঙ্গে চুক্তি ভাঙতে চাইলে আরবরা বিসমিল্লাহ ছাড়া চিঠি লিখত। সুরা তওবায় মুশরিকদের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের ঘোষণা থাকায় তৎকালীন রীতি অনুযায়ী বিসমিল্লাহ পড়া হয়নি।

  • ২. সাহাবিদের মতভেদ: কোরআন লেখার সময় সাহাবিদের কেউ বলেছেন আনফাল ও তওবা একই সুরা, কেউ বলেছেন দুটি আলাদা সুরা। তাই মাঝখানে ফাঁকা রাখা হয়েছে (দুই সুরার মতের জন্য) এবং বিসমিল্লাহ লেখা হয়নি (এক সুরার মতের জন্য)।

  • ৩. রহমত ও নিরাপত্তার সঙ্গে অসংগতি: আলী (রা.)-এর মতে, বিসমিল্লাহ হলো আমান (নিরাপত্তা), আর সুরা তওবা অবতীর্ণ হয়েছে তরবারি নিয়ে, এতে মোনাফেকদের জন্য নিরাপত্তা নেই।

সুরা তওবাতে কি রহমত নেই?

বিসমিল্লাহতে আল্লাহর দুটি গুণবাচক নাম আছে-আর-রহমান ও আর-রহিম। সুরা তওবায় বিসমিল্লাহ না থাকায় কারও মনে হতে পারে, এতে বোধহয় রহমত ও ক্ষমার স্থান নেই। কিন্তু সুরাটি পড়লে এ ধারণা পরিবর্তন হয়ে যাবে। কঠোর ঘোষণার পাশাপাশি এ সুরায় ক্ষমা ও তওবা কবুলের কথাও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।

সুরা তওবার শুরুতে বিসমিল্লাহ না থাকা কোরআনের বিন্যাস ও সংকলন ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কোরআনের প্রতিটি শব্দ ও বিন্যাস নিয়ে আলোচনায় আবেগ বা প্রচলিত ধারণার চেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিলকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।