বিশ্বের সবচেয়ে দামি মসলাগুলোর একটি জাফরান। গাঢ় লাল রং, বিশেষ ঘ্রাণ আর সংগ্রহের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে এটি পরিচিত ‘লাল স্বর্ণ’ নামে। কিন্তু একসময় জাফরান চাষের জন্য বিখ্যাত ভারতের কাশ্মির উপত্যকায় এখন এই মূল্যবান ফসলের উৎপাদন নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। জলবায়ুর পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টি ও দীর্ঘ খরার প্রভাব পড়ছে চাষে।

কাশ্মিরের শ্রীনগরের পুরোনো বাজারে গেলেই বোঝা যায়, স্থানীয় জাফরান এখন কতটা মূল্যবান। দোকানিরা পাম্পোরের আসল জাফরান আলাদা করে রাখছেন। তাঁদের অভিযোগ, বাজারে ইরানি জাফরান কাশ্মিরি পণ্য হিসেবে বিক্রির ঘটনা ঘটছে। এমনকি অন্য ফুল ও রং মিশিয়ে ভেজাল পণ্য বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, মান ও ঘ্রাণের দিক থেকে কাশ্মিরি জাফরানের আলাদা পরিচিতি রয়েছে।

কাশ্মিরের লাল স্বর্ণ জাফরান
কাশ্মিরের ঐতিহ্যবাহী জাফরান, যা ‘লাল স্বর্ণ’ নামে পরিচিত। ছবি: সংগৃহীত

কাশ্মিরের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির সঙ্গেও জাফরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বিয়ের খাবার, ঐতিহ্যবাহী নুন চা, ওষুধ ও সুগন্ধি তৈরিতে এটি ব্যবহৃত হয়। সাধারণত অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত জাফরান সংগ্রহ করা হয়। এ সময় কারেওয়া মালভূমিতে বেগুনি ক্রোকাস ফুল ফোটে। ভোরের আলো ফোটার আগেই কৃষকেরা মাঠে গিয়ে ফুল সংগ্রহ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক জমিতেই ফুলের সংখ্যা কমে গেছে।

একজন কৃষকের অভিজ্ঞতা উৎপাদন কমে যাওয়ার চিত্র তুলে ধরে। গত বছর যেখানে তিনি প্রায় দেড় কেজি জাফরান পেয়েছিলেন, এবার তাঁর সংগ্রহ মাত্র ২৫০ গ্রামের মতো। কৃষকদের মতে, জাফরান চাষের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে বৃষ্টি অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে ফুল ও কন্দের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

জাফরান উৎপাদনের প্রক্রিয়াটিও বেশ শ্রমসাধ্য। ক্রোকাস স্যাটিভাস ফুলের প্রতিটিতে থাকে তিনটি লাল পরাগদণ্ড। সেগুলো হাতে তুলে আলাদা করে শুকাতে হয়। প্রায় চার হাজার ফুল থেকে পাওয়া যায় মাত্র এক আউন্স বা ২৮ গ্রাম জাফরান। বছরে মাত্র দুই থেকে চার সপ্তাহ ফুল ফোটার সুযোগ থাকায় উৎপাদন সীমিত থাকে। কাশ্মির ও জম্মু অঞ্চলে ২০১০-১১ সালে যেখানে আট টন জাফরান উৎপাদিত হয়েছিল, ২০২৩-২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৬ টনে।

কাশ্মিরের লাল স্বর্ণ জাফরান
কাশ্মিরের ঐতিহ্যবাহী জাফরান, যা ‘লাল স্বর্ণ’ নামে পরিচিত। ছবি: সংগৃহীত

গবেষকদের মতে, দীর্ঘায়িত শুষ্ক মৌসুম, বৃষ্টিপাতের অনিয়ম এবং তুষারপাতের ধরনে পরিবর্তন মাটির আর্দ্রতা ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর প্রভাব ফেলছে। তবে সংকট মোকাবিলায় গবেষণাও চলছে। শ্রীনগরের কাছে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জাফরান চাষের পরীক্ষা করছেন উদ্যানতত্ত্ব বিজ্ঞানী নেয়াজ আহমদ দার। তাঁর প্রাথমিক গবেষণায় নিয়ন্ত্রিত কক্ষে ফুল ফোটানোর স্থিতিশীলতা এবং জাফরানের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ক্রোসিন ধরে রাখার ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এই গবেষণা ভবিষ্যতে কাশ্মিরের জাফরান চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।