চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে দীর্ঘদিনের যানজট কমাতে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। পটিয়া, দোহাজারী, কেরানীহাট, লোহাগাড়ার আমিরাবাদ ও চকরিয়ায় নির্মাণ করা হবে বাইপাস, চার লেনের সড়ক ও ফ্লাইওভার। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের চলাচল আরও নির্বিঘ্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ২০২২ সালের মাঠপর্যায়ের সমীক্ষার ভিত্তিতে ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প’ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের বিভিন্ন অংশের বিস্তারিত নকশা তৈরির কাজ চলছে। তবে এখনো ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হয়নি। ফলে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের আগে আরও কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পটিয়া সদর, দোহাজারী, কেরানীহাট, আমিরাবাদ ও চকরিয়া এলাকায় মহাসড়কের দুই পাশে বাজার গড়ে উঠেছে। সড়ক ও ফুটপাতের অংশ দখল করে অস্থায়ী দোকানপাট বসানো এবং ধীরগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে এসব এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। এতে দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী ট্রাককে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পটিয়ায় বিদ্যমান বাইপাসের গতিপথ ধরে ৫ দশমিক ৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন করা হবে। পাশাপাশি সড়কের কিছু বাঁক সোজা করে প্রশস্ত ও আধুনিক করার উদ্যোগ রয়েছে। চন্দনাইশের দোহাজারীতে ৩ দশমিক ৩ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সাতকানিয়ার কেরানীহাটে নির্মাণ করা হবে ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভার। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের সঙ্গে সড়কের সংযোগস্থলে যান চলাচলের বাধা কমানো এই পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য। অন্যদিকে লোহাগাড়ার আমিরাবাদে ৫ দশমিক ১ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হবে। চকরিয়ায় নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে ৬ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের বাইপাস।
প্রস্তাবিত নকশায় সড়কের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে চার লেনের সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি যানবাহনের চাপ বাড়লে ছয় লেনে উন্নীত করার সুযোগ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় ও ধীরগতির যানবাহনের জন্য মহাসড়কের দুই পাশে দুই লেনের সার্ভিস রোড রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কেরানীহাটের ফ্লাইওভারের উড়াল অংশে ছয় লেনের সুবিধা রাখার কথাও রয়েছে।
প্রকল্পের উপপরিচালক নাসরিন আরা শাহীন জানিয়েছেন, প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৫৫ হাজার ৬১৬ দশমিক ৬০ লাখ টাকা, যা ৮ হাজার ৫৫৬ কোটি ১৬ লাখ ৬০ হাজার টাকার সমান। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ২ হাজার ৮৪৭ কোটি ৪ লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং প্রকল্প সহায়তা থেকে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ১১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে; ভূমি অধিগ্রহণ এখনো শুরু হয়নি।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জাইকার সমীক্ষা অনুযায়ী পটিয়ার ইন্দ্রপুল খাল, চন্দনাইশের বরুমতি খাল, দোহাজারীর শঙ্খ নদী ও চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর ওপর ছয় লেনের সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এসব অবকাঠামোর পাশাপাশি মহাসড়কের যানজটপূর্ণ অংশগুলোর উন্নয়ন যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে পারে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক শুধু পর্যটকদের যাতায়াতের পথ নয়, পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বিভিন্ন এলাকায় পণ্য নেওয়া এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনে এ সড়ক বড় ভূমিকা রাখে। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনের হলেও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অংশের বড় অংশ এখনো দুই লেনের।
জাইকার সমীক্ষায় মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে এ মহাসড়কে পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ বাড়ার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। তখন চট্টগ্রাম ও ঢাকার বাণিজ্যিক ও শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে বন্দরের যোগাযোগে সড়কটির গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাইপাস, চার লেনের সড়ক ও ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে বড় উদ্যোগ। তবে বিস্তারিত নকশা, ভূমি অধিগ্রহণ এবং পরবর্তী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই প্রকল্পের কাজ এগোবে। তাই পরিকল্পনার সুফল পেতে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও যাত্রীদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন