চট্টগ্রামের মানুষের মুখের ভাষা চাটগাঁইয়া। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ভাষায় কথা বললেও লিখিত রূপের ক্ষেত্রে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। বিশেষ করে চাটগাঁইয়ার নিজস্ব উচ্চারণ, স্বরের ওঠানামা ও ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য বাংলা বর্ণমালায় যথাযথভাবে তুলে ধরা কঠিন। এই সমস্যা সমাধানে লাতিন বর্ণমালাভিত্তিক ‘ইউরো লাতিন’ নামে একটি লিখন পদ্ধতি তৈরি করেছেন চাটগাঁইয়া ভাষা নিয়ে কাজ করা কয়েকজন তরুণ।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই পদ্ধতিতে চাটগাঁইয়া ভাষায় সংবাদ প্রকাশের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ‘দেয়াং’সহ কয়েকটি ফেসবুক পেজে লাতিন বর্ণের সঙ্গে বিশেষ স্বরচিহ্ন ব্যবহার করে স্থানীয় ভাষায় খবর প্রকাশ করা হচ্ছে। প্রথম দেখায় লেখাগুলো বিদেশি কোনো ভাষা মনে হলেও এগুলো মূলত চট্টগ্রামের মানুষের পরিচিত কথ্য ভাষার লিখিত রূপ।

চাটগাঁইয়াকে ঘিরে দীর্ঘদিনের একটি বিতর্ক রয়েছে। এটি বাংলার একটি উপভাষা, নাকি স্বতন্ত্র ভাষা, তা নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে মতভিন্নতা আছে। বাংলা ও চাটগাঁইয়া উভয়ের শিকড় পূর্বাঞ্চলীয় ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীতে হলেও সময়ের সঙ্গে ভাষা দুটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিকশিত হয়েছে। চাটগাঁইয়ার শব্দভান্ডার, ব্যাকরণ ও উচ্চারণে এমন কিছু পার্থক্য রয়েছে, যার কারণে অনেক প্রমিত বাংলাভাষীর পক্ষেও ভাষাটি সহজে বোঝা সম্ভব হয় না।

ভাষাবিদ কলিন মাসিকা তাঁর The Indo-Aryan Languages বইয়ে চাটগাঁইয়ার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সভাপতি তাসলিমা বেগমের মতে, চাটগাঁইয়াকে পৃথক ভাষা হিসেবে চূড়ান্তভাবে শ্রেণিবদ্ধ করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। অর্থাৎ, ভাষাটির স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে এখনো একক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।

কীভাবে তৈরি হলো ইউরো লাতিন?

চাটগাঁইয়া ভাষার শব্দভান্ডার সংরক্ষণ এবং ভাষাটির লিখিত রূপ তৈরির উদ্দেশ্যে ২০২১ সালের জুনে অনলাইনে যাত্রা শুরু করে ‘চিটাগোনিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ একাডেমি’। কয়েকজন তরুণের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্মের অন্যতম লক্ষ্য হলো হারিয়ে যেতে বসা চাটগাঁইয়া শব্দ সংগ্রহ, ভাষা নিয়ে গবেষণা এবং স্থানীয় সংস্কৃতি, সাহিত্য ও গান সংরক্ষণ করা।

একাডেমির সহপ্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে চাটগাঁইয়াকে অশুদ্ধ বা বিকৃত ভাষা হিসেবে দেখা হয়। এমনকি কিছু পরিবারেও শিশুদের এই ভাষা শেখানোর আগ্রহ কমে যাচ্ছে। ফলে সময়ের সঙ্গে অনেক স্থানীয় শব্দ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভাষাটির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানো এবং এর নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরতেই তাঁরা কাজ করছেন।

প্রথমদিকে বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করেই চাটগাঁইয়া লেখার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে উচ্চারণ ও ধ্বনির পার্থক্য যথাযথভাবে প্রকাশ করতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখে পড়েন উদ্যোক্তারা। পরে ফার্সি-আরবি হরফ এবং নতুন বর্ণমালা নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। শেষ পর্যন্ত লাতিন বর্ণমালার সঙ্গে বিশেষ স্বরচিহ্ন যুক্ত করে তৈরি করা হয় ইউরো লাতিন পদ্ধতি।

ইউরো লাতিন ব্যবহারের অন্যতম কারণ চাটগাঁইয়া ভাষার টোন বা স্বরের ওঠানামা। এই ভাষায় উচ্চ, নিচু ও সাধারণ স্বরের পার্থক্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের শব্দে স্বরের অবস্থান পরিবর্তিত হলে অর্থও বদলে যায়। বাংলা বর্ণমালায় এই পার্থক্যগুলো সহজে বোঝানোর নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই।

বাংলা বর্ণমালার বদলে লাতিন হরফ কেন?

ইউরো লাতিন ব্যবহারের অন্যতম কারণ চাটগাঁইয়া ভাষার টোন বা স্বরের ওঠানামা। এই ভাষায় উচ্চ, নিচু ও সাধারণ স্বরের পার্থক্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের শব্দে স্বরের অবস্থান পরিবর্তিত হলে অর্থও বদলে যায়। বাংলা বর্ণমালায় এই পার্থক্যগুলো সহজে বোঝানোর নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই।

ইউরো লাতিনে স্বরবর্ণের ওপর বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করে এই টোন প্রকাশ করা হয়। যেমন, ‘á’, ‘ó’ ও ‘í’-এর মতো অক্ষরে ঊর্ধ্বমুখী চিহ্ন উচ্চ টোন নির্দেশ করে। আবার চিহ্নটি কোন স্বরবর্ণের ওপর বসছে, তার ওপর নির্ভর করে শব্দের উচ্চারণ ও অর্থের পার্থক্য বোঝা যায়।

উদাহরণ হিসেবে, চাটগাঁইয়া ভাষায় ‘ভিক্ষুক’ ও ‘পুকুর’ বোঝাতে ব্যবহৃত দুটি শব্দ ইউরো লাতিনে ‘Fóir’ ও ‘Foír’ হিসেবে লেখা হয়। এখানে স্বরচিহ্নের অবস্থান বদলানোর কারণে শব্দ দুটির অর্থও আলাদা হয়েছে। এভাবে বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করে ভাষাটির উচ্চারণের সূক্ষ্ম পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সংবাদমাধ্যমেও বাড়ছে ব্যবহার

ইউরো লাতিন এখন শুধু ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগে সীমাবদ্ধ নেই। চট্টগ্রামকেন্দ্রিক স্থানীয় সংবাদ প্রকাশেও এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। একাডেমির নিজস্ব প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি ‘দেয়াং’, ‘চেরাগী’ ও ‘দ্য চিটাগোনিস্ট’ নামের কয়েকটি পেজ এই পদ্ধতিতে সংবাদ প্রকাশ করছে।

‘দেয়াং’-এর প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ মুবিনুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য শুধু নতুন একটি লিখন পদ্ধতি তৈরি করা নয়, বরং চাটগাঁইয়া ভাষাকে যথাসম্ভব নির্ভুলভাবে প্রকাশ করা এবং লেখার পদ্ধতিকে সবার ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা।

তাঁর মতে, চট্টগ্রামে একাধিক আঞ্চলিক উচ্চারণরীতি রয়েছে। বর্তমানে ‘দেয়াং’ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের উচ্চারণরীতি অনুসরণ করে সংবাদ প্রকাশ করছে। ভবিষ্যতে অন্য এলাকার উচ্চারণরীতিও তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোনো একটি উচ্চারণকে সবার জন্য মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য তাঁদের নেই।

ইউরো লাতিন কি সবাই গ্রহণ করবেন?

নতুন এই লিখন পদ্ধতি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হলেও এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলা বর্ণমালায় অভ্যস্ত পাঠকদের কাছে লাতিন অক্ষরের সঙ্গে বিশেষ স্বরচিহ্নের ব্যবহার শুরুতে কঠিন মনে হতে পারে। বিশেষ করে টোনের পার্থক্য বোঝার জন্য পাঠকদের নতুন করে অভ্যস্ত হতে হবে।

এ ছাড়া চাটগাঁইয়া ভাষাভাষী মানুষের বড় একটি অংশ এখনো এই পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত নন। তাই ইউরো লাতিন কতটা সহজে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে, তা সময়ই বলে দেবে।

তবে ভাষা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে উদ্যোগটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। স্থানীয় ভাষার হারিয়ে যাওয়া শব্দ সংগ্রহ, নিজস্ব উচ্চারণ সংরক্ষণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাটগাঁইয়ার ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি ভূমিকা রাখতে পারে। শেষ পর্যন্ত এই লিখন পদ্ধতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে চাটগাঁইয়া ভাষাভাষী মানুষের আগ্রহ, ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্যতার ওপর।