নওগাঁ জেলা প্রতিনিধিঃ শ্রী সুদাম চন্দ্র

সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুনে পুড়ে নিহত নওগাঁর পাঁচজনসহ সাত বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পৌঁছে।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে মরদেহগুলো একে একে নিহতদের শহর ও গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

এর আগে এদিন সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে লাশগুলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনা হয়। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রক্রিয়া শেষ করে বিমানবন্দর থেকে মরদেহগুলো স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

তবে মরদেহগুলো নিতে গত শুক্রবার (৩০অক্টোবর) সন্ধ্যায় নিহত পরিবারের পক্ষ থেকে স্বজনরা ঢাকায় পৌঁছান এবং শনিবার বিকেলে লাশের গাড়ি নিয়ে তারা শহর ও আত্রাই উপজেলায় আসেন। লাশগুলো নিজ নিজ বাড়ি পৌঁছার পর এলাকা জুড়ে শুরু হয় শোকের মাতম।

স্বজনদের আহাজারি ও কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

লাশের স্বজনরা শুধুই বিলাপ করতে থাকেন এবং নানা আবেগের কথা ব্যক্ত করতে থাকেন। পরে প্রত্যেকের এলাকায় জানাজা নামাজ শেষে লাশগুলো দাফন করা হয়। ​

গত ৯ আগস্ট রিয়াদের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মোট ১৬ জন বাংলাদেশি নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ১২ জনের বাড়িই নওগাঁ জেলায়। আবার তাদের মধ্যে ১১জনের বাড়িই ছিল জেলার আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে।

ঘটনার পর গত ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় সাতজনের লাশ দেশে আনা সম্ভব হলেও আগুনে পুড়ে চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় বাকিদের পরিচয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষার পর নিশ্চিত হয়ে পৌনে তিন মাস পর বাকিদের লাশ স্বজনদের কাছে ফেরানো হলো।

এদিকে গতকাল বিকেলে লাশগুলো নিজ নিজ বাড়ি পৌঁছার পর সেখানে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। পরে শনিবার সন্ধ্যায় নিজ নিজ গ্রামে জানাজা শেষে তাঁদের দাফন সম্পন্ন হয়।।

ডিএনএ টেস্টে শনাক্ত হওয়া নওগাঁর পাঁচজন হলেন, নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকার মজনু রহমানের ছেলে শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের নাজমুল হুদার ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, একই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস প্রামানিকের ছেলে মিনহাজ প্রামানিক, মাধবপুর গ্রামের মজনু সরদারের ছেলে মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের আজহার আলীর ছেলে সাগর আলী। এছাড়া নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীরপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ শামীম ও খাজুরা গ্রামের সাব্বির হোসেনের লাশও একই সঙ্গে ফেরানো হয়েছে।

নিহতদের প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অভাব-অনটনের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ভিটেমাটি বন্ধক রেখে ও চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তারা সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। স্বজনদের চোখে ছিল সচ্ছলতার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এক লহমায় ছাই হয়ে কফিনে ফিরলেও স্বজনদের কাঁধে ঋণের বোঝা চেপে বসেছে।

নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ, আত্রাই উপজেলার মাধবপুর, সাধনগর ও মধ্যবোয়ালিয়া গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, গ্রামগুলোর মেঠোপথ ধরে যখন একে একে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সগুলো প্রবেশ করছিল, তখন এগুলোর সাইরেন যেন পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিচ্ছিল। একসময় যে পথ দিয়ে প্রবাসফেরত স্বজনদের হাসিমুখে ঘরে ফেরার কথা ছিল, আজ সেই পথ দিয়েই ফিরল তাঁদের নিথর দেহ। অ্যাম্বুলেন্স থামতেই প্রিয় মুখটিকে শেষবার দেখতে ছুটে আসে সর্বস্তরের মানুষ। স্বজনদের হৃদয়বিদারক আহাজারিতে চারপাশের বাতাসও যেন ভারী হয়ে ওঠে।

পার-নওগাঁ এলাকার নিহত শাহিনের মা নার্গিস বেগম বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘ তিন মাস আগে এনজিও থ্যাকে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ করে ছাওয়ালটাকে বিদেশ পাঠাইছিলাম। আগুনে হামার সব শ্যাষ হয়ে গেল। শাহিনের ছোট ছোট দুইটা ছাওয়াল, ওগুলা এখন কী খাইবে? আর এতগুলা টাকা ঋণ আমরা কীভাবে শোধ করমু?”

তিনি আরও বলেন, শাহিনকে বলছিলাম বাবারে তুই তো জানিস আমি কিছু ফল কিনে খাই, তাই আমাকে কিছু টাকা পাঠা। ছেলে আমার ১২ তারিখে টাকা পাঠাতে চেয়েছিল আর বলেছিল ফল কিনে খাইও। কিন্তু টাকা আর পাঠানো হলো না, আমার ছেলেটা আগুনে পুড়ে মরে গেলো। আমার বুকের ধনটা আমাকে রেখে চলে গেলো। আমি তো একা হয়ে গেলাম, আমি এখন বাঁচবো কী করে।

আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভর মা হেলেনা বেগম বলেন, তার ছেলের মৃত্যুর আগের শুক্রবার দুপুরের দিকে ছেলের সাথে তার কথা হয়। বিশেষ করে সংসারের ঋণের টাকা পরিশোধের বিষয় কথা হয়। তবে সেই ঋণ আর পরিশোধ করা সম্ভব হলো না।

ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই আমার ছেলের মর্মান্তিক বিদায় মেনে নেওয়া আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর। আমাদের এ ঋণ পরিশোধ ও সংসারের অভাব মোচনে প্রধান মন্ত্রীর সহায়তা কামনা করেন তিনি। ​

একই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজের মা পারুল বিবি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলে বলত আম্মু কারখানায় কাজ পেয়েছি, দুই বছর পর বাড়ি আসব। আজ ছেলে ফিরে এল, কিন্তু নিথর দেহে।’

ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা মাসিদুলের বৃদ্ধ বাবা মজনু সরদার বলেন, ‘ভাবছিলাম জীবনের শেষ বয়সে ছাওয়াল সুখের দিন আনবে। তা না হয়ে এই বয়সে এসে নিজের হাতে ছেলের কফিন নামাতে হলো। এই শোক সহ্যের ক্ষমতা আমার নেই।’

একই দশা সাধনগর গ্রামের নিহত সাগর আলীর ঘরে। সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে স্বামীকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন স্ত্রী পারভীন খাতুন। তিনি বলেন, ‘ঘরে দুইটা অবুঝ বাচ্চা, ঋণের এক টাকাও শোধ হয় নাই। ওদের নিয়ে এখন আমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?’

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, অগ্নিকাণ্ডে আমার উপজেলার ১১ জন রেমিট্যান্স যোদ্ধাকে হারিয়ে আমরা গভীর শোকাহত। পূর্বে আসা ৭ জনের লাশের জানাজা আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একত্রে করেছিলাম। এ চার জনের লাশও ঢাকা থেকে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসার ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারকে সব রকমের সহযোগিতা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নিহতদের দাফন-কাফনের জন্য আপাতত পরিবারপ্রতি ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিন মাস পর সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ৩ লাখ টাকা করে অনুদান প্রদান করা হবে।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় ও বিনামূল্যে মরদেহগুলো নিহতদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং পরিবারগুলোর প্রতি জেলা প্রশাসন সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

এদিকে বোয়ালিয়া গ্রামের নিহত মিনহাজের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মিনহাজের মরদেহ গ্রামে পৌঁছাতে কিছুটা দেরি হয়। শনিবার বিকেল সাড় ৪টার দিকে মরদেহ বাড়িতে পৌঁছায়। দীর্ঘ দিন পর সন্তানের লাশ সামনে পেয়ে ভেঙে পড়েন বৃদ্ধা মা। শেষবারের মতো সন্তানকে কাছে রাখার এবং শেষ নজর দেখার আকুতি জানান তিনি। মায়ের শেষ ইচ্ছা এবং আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি বিবেচনায় শনিবার রাতে মরদেহ নিজ বাড়িতেই রাখা হয়।

নিহতের ভাবি মোছা. তাসলিমা জানান, স্বজন ও এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে রবিবার (১নভেম্বর) সকাল ১০টায় বোয়ালিয়া গ্রামে মিনহাজের জানাজা শেষ করা হবে। জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।