২০০৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এক অভাবনীয় ইতিহাস গড়েন বারাক ওবামা। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ প্রেসিডেন্ট হবেন, তা একসময় কল্পনার বাইরে থাকলেও ওই বছরের ৪ নভেম্বর সেই কল্পনাকেই বাস্তবে রূপ দেন তিনি। নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে ২ নভেম্বর তার নানি ম্যাডেলিন ডানহ্যাম মারা যান, যিনি তাকে কোলে-পিঠে করে বড় করেছিলেন। নানিকে হারিয়ে শোকাহত ওবামার জীবনে ৪ নভেম্বর আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত-যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪তম এবং প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি।
হাওয়াই থেকে হোয়াইট হাউসের দীর্ঘ পথচলা
১৯৬১ সালের ৪ আগস্ট হাওয়াইয়ের হনলুলুতে জন্মগ্রহণ করেন ওবামা। মা শ্বেতাঙ্গ মার্কিন নাগরিক এবং বাবা কেনিয়ার হলেও মাত্র দুই বছর বয়সে তার মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর নানা-নানির কাছেই তার বেড়ে ওঠা এবং মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর শৈশবের কয়েক বছর কাটে ইন্দোনেশিয়ায়। ১৯৯০ সালে হার্ভার্ড ল রিভিউয়ের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সভাপতি নির্বাচিত হয়ে তিনি সবার নজর কাড়েন। পরবর্তীতে শিকাগোর একটি আইন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করার সময় মিশেল রবিনসনের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং ১৯৯২ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
সংকট মোকাবিলা ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি
ওবামা এমন এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাল ধরেন, যখন দেশটি চরম আর্থিক সংকটে বিপর্যস্ত এবং ইরাক যুদ্ধ নিয়ে সর্বত্র হতাশা বিরাজ করছিল। এমন পরিস্থিতিতে ‘চেঞ্জ উই ক্যান বিলিভ ইন’ বা ‘ইয়েস উই ক্যান’ স্লোগান তুলে তিনি মার্কিন নাগরিকদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ওবামা ৩৬৫টি ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে রিপাবলিকান প্রার্থী জন ম্যাককেইনকে (১৭৩ ভোট) পরাজিত করেন। ২০১২ সালের নির্বাচনে মিট রমনিকে হারিয়ে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাফল্য ও বিতর্ক
২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে তিনি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন এবং তার মেয়াদে বেকারত্বের হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে। তার অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ অর্জন ছিল স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার, যা ‘ওবামাকেয়ার’ নামে পরিচিতি পায়। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সহযোগিতা জোরদারে অবদানের জন্য ২০০৯ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন এবং তার নির্দেশেই ২০১১ সালে পাকিস্তানে অভিযান চালিয়ে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া ২০১৫ সালে সমলিঙ্গের বিয়ের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের রায়কেও তিনি স্বাগত জানান।
তবে তার মেয়াদে কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপও ছিল। বিদেশে বিশেষ করে পাকিস্তান, ইয়েমেন ও সোমালিয়ায় ওবামার অনুমোদনে অন্তত ৫৪২টি ড্রোন হামলা চালানো হয়, যাতে ৩২৪ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। এ ছাড়া ২০১৩ সালে এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা তথ্যে এনএসএ-এর নজরদারি কর্মসূচি এবং লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে তার প্রশাসন সমালোচিত হয়।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ও জিএসপি বাতিল
বাংলাদেশের সঙ্গে ওবামা প্রশাসনের সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ২০০৯ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ প্রদান। তবে ২০১৩ সালের ২৭ জুন রানা প্লাজা ধস ও তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডের পর শ্রম অধিকার ও কারখানার নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশকে দেওয়া জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে ওবামা প্রশাসন।
ক্ষমতা হস্তান্তর ও বর্তমান জীবন
২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর ওবামা বই লেখা, চলচ্চিত্র ও পডকাস্ট প্রযোজনা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। স্ত্রী মিশেলকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘হায়ার গ্রাউন্ড’। বর্তমানে ৬৫ বছর বয়সী ওবামা নিজে নির্বাচনে না লড়লেও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থীদের হয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় এখনো সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জোরালো বক্তব্য রাখছেন।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন