জাকাত দেওয়া হলে রাষ্ট্রকে আলাদা করে কর দিতে হবে কি না, এ নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, ইসলামে জাকাত বাধ্যতামূলক হওয়ায় রাষ্ট্রীয় কর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার কর ফাঁকি দিলেও ধর্মীয়ভাবে অপরাধ হবে না- এমন ধারণাও কারও কারও মধ্যে দেখা যায়। তবে ইসলামি নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্বের আলোচনায় বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক শুধু সুযোগ-সুবিধা ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাগরিক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ করেন। এসব কার্যক্রম পরিচালনায় রাষ্ট্রের অর্থের প্রয়োজন হয়, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস কর। তাই আইন অনুযায়ী নির্ধারিত কর পরিশোধকে নাগরিকের দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। আর ইচ্ছাকৃতভাবে কর ফাঁকি দেওয়া রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের পারস্পরিক দায়িত্বের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ইসলামেও অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদার প্রথম আয়াতে মুমিনদের অঙ্গীকার পূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুরা মুমিনুনের ৮ নম্বর আয়াতেও সফল মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার কথা উল্লেখ রয়েছে। ইসলামি নৈতিকতার আলোকে, রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন মেনে নাগরিক সুবিধা গ্রহণ করার পর আইনসম্মত কর পরিশোধে ইচ্ছাকৃতভাবে বিরত থাকা অঙ্গীকার ভঙ্গের শামিল হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে জাকাত ও করের পার্থক্য বোঝা জরুরি। জাকাত ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিধান এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে তা আদায় করা ফরজ। কোরআনে জাকাতের অর্থ ব্যয়ের খাতও নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ। সড়ক, হাসপাতাল, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন জনসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় রাষ্ট্র করের অর্থ ব্যবহার করে। ফলে জাকাত ও করের উদ্দেশ্য এবং ব্যবস্থাপনা এক নয়।
ইসলামি চিন্তাবিদদের আলোচনায়ও রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজনে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি উঠে এসেছে। ইমাম কুরতুবির আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন গ্রন্থে এমন পরিস্থিতির আলোচনা রয়েছে, যখন সাধারণ জাকাতের অর্থ দিয়ে সমাজের জরুরি প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয় না। দেশের প্রতিরক্ষা কিংবা বড় জনকল্যাণমূলক কাজের মতো প্রয়োজনে সামর্থ্যবানদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার সুযোগের কথা সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে সুনানে তিরমিজির ৬৫৯ নম্বর হাদিসে সম্পদের ওপর জাকাত ছাড়াও অন্য অধিকারের কথা বর্ণিত হয়েছে।
এই আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অন্যের অধিকার। রাষ্ট্রীয় করের অর্থ জনসাধারণের নানা প্রয়োজন পূরণে ব্যবহৃত হয়। কেউ আইন অনুযায়ী কর দেওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে তা গোপন করলে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সেবার ওপরও পড়তে পারে। তাই জাকাত আদায় করাকে রাষ্ট্রীয় কর ফাঁকির অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়। তবে করের হার, ধরন বা আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি থাকলে তা আইনসম্মত উপায়ে জানানো উচিত; গোপনে কর ফাঁকি দেওয়া তার সমাধান নয়।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন