এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতিতে বদলে যাচ্ছে শিক্ষা, চাকরি ও কর্মক্ষেত্রের ধরন। আগামী পাঁচ বছরে এই পরিবর্তন আরও বাড়বে বলে মনে করছেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করে এর সঠিক ব্যবহার শেখা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো এবং নিজের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শাহ্‌রিন ইসলাম মনে করেন, এআইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেই ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এ জন্য তিনি প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং শেখার পরিকল্পনা করছেন। ইউটিউবের বিভিন্ন বিনা মূল্যের কোর্সের পাশাপাশি নোটবুকএলএম, পারপ্লেক্সিটি ও জেস্টোরের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গবেষণার দক্ষতা বাড়াচ্ছেন।

শাহ্‌রিন ইসলাম
শাহ্‌রিন ইসলাম, ইংরেজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছবি: সংগৃহীত

শাহ্‌রিনের মতে, এআই তথ্য দিতে পারলেও সব সময় নির্ভুল বা প্রাসঙ্গিক তথ্য দিতে পারে না। তাই তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও যথার্থতা যাচাই করতে মানুষের নিজস্ব জ্ঞান ও বিচারবোধ প্রয়োজন। তাঁর ধারণা, আগামী দিনে যুক্তিনির্ভর চিন্তা, সৃজনশীলতা ও এআইভিত্তিক দক্ষতা সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি বিভাগের শিক্ষার্থী নুর হোসাইন এআইকে কনটেন্ট তৈরির কাজে ব্যবহার করছেন। চ্যাটজিপিটি ও জেমিনাইয়ের সাহায্যে স্টোরিবোর্ড তৈরি এবং প্রি-ভিজ্যুয়ালাইজেশনের কাজ করছেন তিনি। পাশাপাশি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ, চলচ্চিত্র উৎসবে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ে গবেষণার সুযোগ খুঁজছেন।

নুর হোসাইন
নুর হোসাইন, টেলিভিশন চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছবি: সংগৃহীত

নুরের বিশ্বাস, এআই অনেক কাজ সহজ করলেও মানুষের সৃজনশীলতা, নৈতিক বিচারবোধ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার গুরুত্ব কমবে না। তাই প্রযুক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে নিজের দক্ষতা ও সম্ভাবনা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে এআইকে কাজে লাগাতে চান তিনি।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মাইশা মুশতাক মনে করেন, শুধু একাডেমিক শিক্ষা বা প্রোগ্রামিং জানলেই ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে এগিয়ে থাকা যাবে না। বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান, টিমওয়ার্ক ও যোগাযোগের দক্ষতাও প্রয়োজন। এ জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছেন এবং এআই টুল ব্যবহার করে নতুন প্রযুক্তি শেখার চেষ্টা করছেন।

মাইশা মুশতাক
মাইশা মুশতাক, কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী তাসফিয়া তারাননুমের লক্ষ্য লেখালেখি, গবেষণা, গ্রাফিকস ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির দক্ষতা বাড়ানো। তাঁর মতে, এআই ব্যবহার করতে পারা আর সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারা এক বিষয় নয়। তথ্য যাচাই, সমালোচনামূলক চিন্তা ও মানুষের অভিজ্ঞতা গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ।

তাসফিয়া তারাননুম
তাসফিয়া তারাননুম, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস ছবি: সংগৃহীত

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফাত নাফিজ মনে করেন, এআইয়ের কারণে প্রচলিত অনেক দক্ষতার গুরুত্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তাই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছেন তিনি। পড়াশোনা ও লেখালেখির কাজে নতুন তথ্য এবং পুরোনো গবেষণা খুঁজে পেতেও এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছেন।

আরাফাত নাফিজ,
আরাফাত নাফিজ, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের শিক্ষার্থী শ্রাবণ দেবনাথ এআই এজেন্ট ও লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) সম্পর্কে জানার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। চ্যাটজিপিটি, ক্লড ও নোটবুকএলএম ব্যবহার করে পড়াশোনা ও তথ্য বিশ্লেষণ করছেন। পাশাপাশি প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, বিশ্লেষণী চিন্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

আরাফাত নাফিজ
আরাফাত নাফিজ, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়.ছবি: সংগৃহীত

শ্রাবণের ধারণা, আগামী পাঁচ বছরে এআই কর্মক্ষেত্রের বড় অংশজুড়ে থাকবে। তখন মানুষকে এআইকে নির্দেশনা দেওয়া, সঠিক তথ্য নির্বাচন এবং বিচারবুদ্ধি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা অর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকানো ও এর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট এআইকে ভয় পাওয়া বা পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়া নয়, বরং প্রযুক্তির সঙ্গে নিজের দক্ষতার সমন্বয় ঘটানোই তাঁদের লক্ষ্য। প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি সৃজনশীলতা, মানবিক গুণাবলি, দায়িত্বশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাই ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে থাকার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।